রাজস্ব ঘাটতি পূরণে এবার আগাম কর নিচ্ছে সরকার

প্রকাশিত: ২:৫০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

 

সু.ডাক ডেস্ক:
রাজস্ব আদায় কমে যাওয়া এবং ব্যয় বাড়ার কারণে আগাম কর নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফলে করদাতাদের এ বছরেই ২০২১-২২ অর্থবছরের আগাম কর পরিশোধ করতে হবে। আগাম কর না দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।এনবিআরের নিয়ম অনুযায়ী একজন করদাতা চলতি অর্থবছরের কর পরিশোধ করবেন; কিন্তু দেশে যুদ্ধাবস্থা বা জাতীয় দুর্যোগ হলে সরকার করদাতাদের থেকে আগাম কর নিতে পারে। আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর ৬৪/৬৫ ধারার বিধান প্রযোজ্য হয়।করোনা মহামারির মধ্যে আগাম করের এ নির্দেশনাকে বাড়তি চাপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। মহামারির মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় রাজস্ব আহরণ গতি হারায়। তারপরও চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আগের চেয়ে সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়িয়েছেন অর্থমন্ত্রী, যা ‘অবাস্তব’ বলে তখনই প্রতিক্রিয়া এসেছিল অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকেব্যবসায়ীরা বলেন, কারোনায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত, ব্যবসার অবস্থা ভালো নেই। চলতি অর্থবছরের কর দেওয়া নিয়েই সবাই হিমশিম খাচ্ছেন। এর মধ্যে আসছে অর্থবছরের কর আগাম দিতে হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে যাবে।সংশ্লিষ্টরা বলেন, করোনাভাইরাস মহামারিতে মানুষের আয়-উপার্জন নেই। সবকিছু খুলে দিলেও অর্থনীতি সচল হয়নি। কতদিনে পুরোপুরি সচল হয়ে আগের জায়গায় ফিরে আসবে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় রাজস্ব আসবে কোত্থেকে? ট্যাক্স দেবেন কে? এদিকে রেমিটেন্স ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকের অবস্থা খারাপ। রেমিট্যান্সের ভালো অবস্থাও আর থাকবে বলে মনে হয় না। জুলাইয়ে রপ্তানি আয় বাড়লেও এটা যে আগামীতে অব্যাহত থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা সচল রাখা সম্ভব হবে তা এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।আগাম কর দেওয়ার চিঠি পাওয়া এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যখন ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ সেই অবস্থায় এ ধরনের কর নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হচ্ছে না। যেখানে চলতি অর্থবছরের কর দেওয়াই দায়, সেখানে এ ধরনের বাড়তি চাপ ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি নিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১২ হাজার ৩৩৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। অথচ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ হাজার ৩৭৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এ হিসাবে অর্থবছরের প্রথম মাসেই লক্ষ্যের চেয়ে ৭ হাজার ৪৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা কম আদায় হয়েছে। শতাংশ হিসাবে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যের চেয়ে ৩৬ দশমিক ৩৫ ভাগ কম হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ের চেয়ে কম আদায় হয়েছে ২২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। অথচ গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম মাসে ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থবছর শুরু হয়েছিল।এনবিআর এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা গেছে, ছোটখাটো অনেক ব্যবসায়ী এনবিআরে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছেন, তারা আর ব্যবসা চালাবেন না। ফলে এসব খাত থেকেও সরকার রাজস্ব হারাবে। আগাম কর নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেবেন।চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এছাড়া আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৭৫ কোটি এবং আমদানি শুল্ক থেকে ৯৫ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।এর মধ্যে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ভ্যাট থেকে ৭ হাজার ৭৩২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে ৪ হাজার ২১৯ কোটি এবং আমদানি শুল্ক থেকে ৭ হাজার ৪২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল।এনবিআরের তথ্যে দেখা যায়, ভ্যাট থেকে ৩ হাজার ৭৩৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, আয়কর ও ভ্রমণ থেকে ৩ হাজার ৬৭০ কোটি ২৬ লাখ এবং আমদানি শুল্ক থেকে ৪ হাজার ৯২৯ কোটি ৩ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে গত অর্থবছরে জুলাইয়ের চেয়ে ভ্যাট আদায় কমেছে ৩৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আয়কর আদায় কমেছে ১৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ আর আমদানি শুল্ক আদায় কমেছে ৭ শূন্য ২ শতাংশ। অর্থবছরের জুলাইয়ে এই তিন খাতে মোট ১৫ হাজার ৮২৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছিল।রাজস্বের এসব ঘাটতি পুষিয়ে নিতে করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দিচ্ছে রাজস্ব বোর্ড। যাতে এ বিশাল বাজেটের আয় বাড়ানো যায়। সরকারের হাতে টাকা নেই, অথচ ব্যয় বেড়েছে। এই ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকার যেমন ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে, তেমনি করদাতাদের কাছ থেকেও ২০২১-২২ অর্থবছরের আগাম কর নিয়ে নিচ্ছে।জানা গেছে, একজন করদাতা ২০১৯-২০ অর্থবছরে যে পরিমাণ কর দিয়েছেন তার সঙ্গে ১৫ শতাংশ যোগ করে কর নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, একজন করদাতা ২০১৯-২০ অর্থবছরে যদি দুই হাজার টাকা কর দিয়ে থাকেন তাহলে তার ২০২১-২২ অর্থবছরে কর ধরা হয়েছে দুই হাজার ৩০০ টাকা। এই টাকার চার ভাগের এক ভাগ চলতি মাসেই অগ্রিম হিসেবে নিয়ে নেবে সরকার, যা পরের অর্থবছরের করের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে আদায় হয় ২ লাখ ১৮ হাজার ৪০৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরে আগাম কর নিয়ে নেওয়াতে এর প্রভাব পড়বে পরের অর্থবছরেও।এ বিষয়ে এনবিআরের সহকারী কর কমিশনার শায়লা আজিজ যায়যায়দিনকে বলেন, তারা চলতি মাসের শুরু থেকেই করদাতাদের চিঠি দিয়েছেন। অনেকে হয়তো সময়মতো চিঠি পাননি। যারা চিঠি পাননি তারা এখনো কর পরিশোধ করতে পারবেন বা কর অফিসে যোগাযোগ করে চিঠি নিতে পারবেন। যাদের ছয় লাখ টাকার ওপরে আয় তাদের এ আগাম কর দিতে হবে বলে তিনি জানান

এই সংবাদটি 12 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ