তাজমহলে ব্যবহৃত পাথরে নির্মিত পাগলা বড় জামে মসজিদ

প্রকাশিত: ২:৩৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

সু.ডাক ডেস্ক:

মহাশিং নদীর কুল ঘেঁষে রাজকীয় মহিমায় দাড়িয়ে আছে স্থাপত্যকলার বিস্ময় হয়ে থাকা এই নিদর্শনটি। এটি সম্পর্কে না জানলে যে কেউ এটাকে সম্রাট আকবরের রাজপ্রাসাদ বা সম্রাট শাহ্জাহান তার প্রিয়তমা মমতাজের প্রতি ভালোবাসার স্মৃতির সেই তাজমহল ভাবতেই পারে। এতে ভুলের কিছু নেই। কারণ তাজমহল নির্মাণে যেসব পাথর ব্যবহার হয়েছিলো এই নিদর্শনটিতেও একই রকম পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। আর সেজন্য দৃষ্টিনন্দন এই প্রাচীন নিদর্শন তার সৌন্দর্যে এই খেতাব অর্জন করে নেয় অনায়াসে। প্রথম দেখায় যে কেউ এর প্রেমে পড়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবেন। তাই তো দিন দিন এটিকে একনজর দেখতে মানুষের ভীড় জমে চোখে পড়ার মতো। এখন এটির নির্মাণ, অবস্থান ও সৌন্দর্যের রহস্য তাহলে জেনে নিন। শত বছরের পুরনো স্থাপত্য নিদর্শন সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পশ্চিম পাগলার রায়পুর গ্রামে অবস্থিত। এবং এটি স্থানীয়ভাবে বড় মসজিদ নামে পরিচিত। মহাশিং নদীর কূল ঘেঁষে রাজকীয় মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকা যে কারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা ঐতিহাসিক এ মসজিদটি নির্মাণের পেছনে রয়েছে নানা ঘটনা। তার আগে জানিয়ে দেই মসজিদের মনকাড়া অপূর্ব সৌন্দর্যের মহিমা।দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকলা ও প্রবাহমান মহাশিং-এর এক বাকসংলগ্ন কূলে দাঁড়িয়ে যেন সভ্যতার ক্রমবিকাশ পর্যবেক্ষণ করছে এই মসজিদ। মসজিদের সামনে বিশাল ঈদগাহ ময়দান ও উত্তর পাশের গেট দিয়ে প্রবেশ করে সামনেই দেখা যায় মহাশিং নদী। আর ডান দিকে তাকালেই সেখানে আপনার নজর আটকে যাবে। সেখানে অবস্থিত পর্যটকদের কাঙ্খিত সেই মনোমুগ্ধকর নিদর্শন। সেখানে হাজির হওয়া মাত্রই যে কেউ এই মসজিদের ভেতরের রূপ দেখার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে যাবেন। ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই ফ্লোর ও তার আশপাশের কারুকার্য দেখলে আশ্চর্য হয়ে মসজিদকে তাজমহল ভেবেই বসে থাকতে হবে। নামাজের জন্য নির্ধারিত মূল স্থান দু’তলায় থাকলেও মসজিদের মিহরাব অংশে জমকালো পাথর কেঁটে আকর্ষণীয় নকশা করা হয়েছে। পুরো মসজিদের চারপাশে তিন ফুট উচ্চতা পর্যন্ত যে কারুকার্য খচিত টাইলস লাগানো হয়েছে, সেটি উঁচুমানের স্থাপত্যশৈলীর ইঙ্গিত দেয়। টাইলসগুলো ইতালি, জার্মানি ও ইংল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল। প্রত্যেক প্রবেশদ্বারে পাথরখচিত খিলান মসজিদটিকে বেশ দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। মসজিদের নিচতলার ছাদ ঢালাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে রেলের ¯ি¬পার। ছাদ ও গম্বুজের চারপাশে পাথর খোদাই করা পাতার ডিজাইন গ্রামীণ ঐতিহ্যের জানান দেয়। মসজিদের দু’তলার মেঝেতে রয়েছে দুর্লভ শ্বেতপাথর, তার চারপাশে ব¬কে দেয়া ব¬্যাক স্টোন বা কালোপাথর তো আরও বেশি দুর্লভ। এগুলো আনা হয়েছে ভারতের জয়পুর থেকে। তখনকার অবিভক্ত ভারতের সাথে নদীপথের যোগাযোগ বেশ সহজ ছিল। মসজিদে ব্যবহৃত এই জাতের পাথর একমাত্র তাজমহলে ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা যায়।মসজিদটি নদীর কূল ঘেঁষে নির্মিত হওয়ায় ডেকার হাওরের পূবালী বাতাস সবসমই মসজিদের ভেতর প্রবেশ করে। এতে মুসলি¬রা নামাজরত অবস্থায় সবসময়ই তাপমাত্রাবান্ধব পরিবেশ পান, যেন স্বর্গীয় এক অনুভূতি লাভ করা যায়। আর্শ্চযের বিষয় হলো, দ্বি-তলা বিশিষ্ট এই স্থাপনাটি কোনো ধরনের রডের ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ ইটের উপর নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদটি ৬৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও বারান্দাসহ ২৫ ফুট প্রস্থের গম্বুজসহ মোট উচ্চতা ৪০ ফুট ও ৬টি স্তম্ভের উপর ৬টি মিনার, তিনটি বিশাল গম্বুজ এবং ছোট সাইজের আরও ১২টি মিনার রয়েছে। মসজিদের ভূমিকম্প নিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে ভূমি খনন করে বেশ মজবুত পাতের উপর স্থাপনাটির ভিত নির্মিত। ফলে অনেকগুলো বড় মাপের ভূমিকম্পও এখন পর্যন্ত মসজিদটিতে ফাটল ধরাতে পারেনি। মসজিদ নির্মাণের পর এখনও বড় ধরনের কোনো সংস্কারের প্রয়োজন পড়েনি। শুধুমাত্র গম্বুজের এক জায়গায় আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে খানিকটা লিকেজ দেখা দিয়েছিল। তখন গম্বুজের উপরের দিকের কিছু পাথর পরিবর্তন করতে হয়েছিল। বিশেষজ্ঞ স্থপতিদের তত্বাবধানে বেশ সতর্কতার সাথে সংস্কার কাজ সম্পাদন করা হয়েছে, যাতে মূল গঠনে কোনোরূপ পরিবর্তন না ঘটে।

মসজিদের নির্মাণ ও রহস্য কথা:
১৩৩১ বঙ্গাব্দের ৫ আশ্বিন শুক্রবার রহস্যময়ী এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। মসজিদের মূল প্রতিষ্ঠাতা ইয়াসিন মির্জা ও তার ভাই ইউসুফ মির্জা মিলে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদটির নির্মাণকাজে মূল মিস্ত্রিসহ জোগালিরা ছিলেন ভারতীয় ও মূল স্থপতির নাম মুমিন আস্তাগার; যার পূর্বপুরুষ ভারতের তাজমহলে কাজ করেছেন বলে জানা যায়। প্রায় ১০ বছর ধরে অসাধারণ এই মসজিদের নির্মাণ কাজ চলে। মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ইয়াসিন মির্জা ও তার ভাই ইউসুফ মির্জা বেশ বিত্তবান এবং ধর্মপরায়ণ ছিলেন। পাশাপাশি তারা চাষাবাদ ও খামারের বিশাল সম্পত্তির মালিক ছিলেন। মসজিদ নির্মাণের পেছনের মূল কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে লোকমুখে নানান জনশ্রুতি রয়েছে। কেউ বলছেন, মহাশিং নদী থেকে অলৌকিকভাবে ৭টি গুপ্তধন পানিতে ভেসে উঠেছিল। আর এগুলো ইয়াসিন মির্জা ও তার ভাই ইউসুফ মির্জা ধার্মিক হওয়ার কারণে সেগুলো দেখেছিলেন এবং নিজেদের কাছে সেগুলো রাখেন। পরে স্বপ্নের মাধ্যমে দেখতে পেলেন এগুলো দিয়ে যেন তারা নদীর পাড়ে মসজিদ নির্মাণ করেন। তাই অনেকে মনে করছেন এখান থেকেই এই মসজিদের অবস্থান হতে পারে।তবে ইয়াসিন মির্জার পরিবারের সূত্রে জানা যায়-ইয়াসিন মির্জার পিতা আদিল হাজী ছিলেন বেশ ধার্মিক। তখনকার সময়ে মুসলমানরা ছিলেন সংখ্যালঘ্যু। পুরো পরগনার মধ্যে তিনিই একমাত্র হাজী ছিলেন। আদিল হাজীকে সবাই পায়ে হেঁটে হজ্বপালনকারী হিসেবে জানতো। ধর্ম-কর্মের প্রতি তার অগাধ মনোনিবেশ থেকে তিনি বর্তমান মসজিদের জায়গাটিতে একটি টিনশেড ঘর তৈরি করেন নামাজের জন্য। আশপাশের গ্রামের মুসলমানরাও এখানে এসে নামাজ আদায় করতেন। পরম্পরাগত ঐতিহ্যের সূত্র ধরেই ইয়াসিন মির্জার মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন জাগে। যে ব্যাপক স্থাপত্য নকশা তিনি হৃদয়পটে এঁকেছিলেন, তাতে মসজিদের নিচতলায় হিফজখানা আর উপরের তলায় নামাজের স্থান নির্ধারিত ছিল। মসজিদের বাইরের অংশকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় করার অভিপ্রায় ছিল ইয়াসিন মির্জার। বাইরের অপরূপ শৈলী যেন সর্বসাধারণকে মসজিদে আসতে উদ্বুদ্ধ করে- এমন প্রত্যাশা ছিল তার মন-মগজে। কিন্তু সে স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়নের মুখ দেখার আগেই তার পৃথিবী থেকে বিদায়ের সময় চলে আসে। আর এতেই আটকে যায় মসজিদ নির্মাণের সকল কাজ। এজন্য পরে বাইরের নকশা আর বাস্তবায়িত হয়নি। তবে তিনি ওসিয়ত করে যান, তার পরিকল্পনা অনুযায়ী মসজিদের কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়িত করার আগে যেন তাদের কবর, এমনকি ঘর-বাড়ি পর্যন্ত পাকা করা না হয়। কিন্তু সেটুকু আর হয়ে ওঠেনি। দু’ ভাইয়ের কবরও আজ পর্যন্ত কাঁচা বেড়া-বাউন্ডারিহীন রয়ে গেছে। দক্ষিণ সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনটি এখনও সরকারের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের দৃষ্টিতে আসেনি ও স্থাপত্য কীর্তিটি এখনও উলে¬খযোগ্যভাবে সরকারি আনুকূল্য পায়নি। মসজিদ দেখতে আসা দর্শনার্থীরা জানান, এটি দেখতে প্রায় তাজমহলের মতো এবং এর ভেতরে যে কারুকার্য রয়েছে তা মনমুগ্ধকর। বিশেষ করে এই দুর্লভপাথরের সাজ দেখে যে কারোর মন কেড়ে ণেবে। যদি এই প্রাচীন নিদর্শনটি সরকারের প্রতœতত্ত অধিদপ্তরের নজরে পড়ে, তবে দেশের পর্যটন ক্ষেত্রের আরেকটি জায়গা পূরণ হবে। ঐতিহ্যবাহী পাগলা বড় জামে মসজিদটি অযতেœ ও অবহেলায় থাকায় আনুষঙ্গিক কাজগুলো মসজিদের নিজস্ব ফান্ড বা চাঁদা সংগ্রহের মাধ্যমে সম্পাদন করা হয়। সরকারের তরফ থেকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ পেলে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি পর্যটন শিল্পে একটা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারতো। তবে অবহেলার ধারাবাহিকতায় দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়তে থাকলে ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না হলে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাগলা বড় জামে মসজিদটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে।মসজিদের উদ্যোক্তা ইয়াসিন মির্জার প্রপৌত্র মনজুর হায়দার বলেন, প্রাচীন এই নিদর্শনটি অবহেলিত ও সরকারের নজরহীনতায় রয়েছে। যদি এই প্রতœতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনটি সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়, তাহলে এই মসজিদটি পর্যটকদের অন্যন্য স্থান হতে পারে। সরকার যেন অতিদ্রুত এর অপার সৌন্দর্য ধরে রাখতে পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

 

এই সংবাদটি 12 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ