জেলায় ৪১২টি মন্ডপে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে ৫দিনের শারদীয় দুর্গোৎসব

প্রকাশিত: ৪:১৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২০

নিজস্ব প্রতিবেদক :
নীলাকাশ, সাদা মেঘের ভেলা আর নদীতীর ও বালুচরে কাশফুল জানান দেয় শরৎ বিরাজমান। জানান দেয় শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তার। যদিও এবার দেবী দুর্গা আসছেন হেমন্তে। কেননা, গত ১৭ সেপ্টেম্বর মহালয়ার পর দেবীপক্ষের সূচনা হলেও এ বছর আশ্বিন মাস ‘মলমাস’ হওয়ায় বরাবরের মতো দেবীপক্ষে দুর্গাপূজা শুরু হয়নি। এর ১ মাস ৫ দিন পর হেমন্ত ঋতুর কার্তিকে অর্থাৎ  ২২ অক্টোবর বৃহ:স্পতিবার ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর আমন্ত্রণের মধ্যদিয়ে শুরু হবে সনাতন হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব সর্বজনীন শারদীয় দুর্গাপূজা। প্রতিটি পূজা ম-পের জন্য তৈরি হয়েছে দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, অসুর, সিংহ, হাঁস, পেঁচা, সর্পসহ বিভিন্ন প্রতিমা। তবে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড পরিস্থিতির কারণে এবার পূজায় উৎসবের আয়োজন থাকবে না।
সনাতন হিন্দুধর্মের সবচেয়ে বৃহৎ সর্বজনীন ধর্মীয় উৎসব ‘শারদীয় দুর্গাপূজা’। সারাদেশের ন্যায় সুনামগঞ্জ জেলায়ও আজ ২২ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্যদিয়ে শুরু হবে। প্রতিটি ম-পে মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রতিমাশিল্পীরা অবিরাম প্রতিমায় রং তুলির বর্ণিল আঁচড়ে দেবী দুর্গার বর্ণিল সাজ-সজ্জার শেষ করেছেন গতকালই।
বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দুরত্ব মেনে সুনামগঞ্জে শারদীয় দুর্গাপূজা আনন্দ-উৎসব মুখরতায় পালনের জন্য বর্ণাঢ্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সুনামগঞ্জ জেলা সূত্রে জানা যায়, এবছর জেলায় ৪১২টি মন্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। যা গত বছরের চেয়ে ২টি বেশি। এরমধ্যে সার্বজনীন ৩৯৯টি, পারিবারিক ১৩টি পূজোর আয়োজন হবে। এবছর সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় মোট ৪৫টি’র মধ্যে-সার্বজনীন ৪৩টি ও পারিবারিক ০২টি। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ পৌরসভায় সার্বজনীন ২৩টি ও পারিবারিক ০। ছাতক উপজেলায় মোট ৩৬টি’র মধ্যে- সার্বজনীন ৩৬টি ও পারিবারিক ০টি। এর মধ্যে ছাতক পৌরসভায় সার্বজনীন ১২টি। জগন্নাথপুর উপজেলায় মোট ৩৯টি’র মধ্যে সার্বজনীন ৩৩টি ও পারিবারিক ০৬টি।এর মধ্যে- জগন্নাথপুর পৌরসভায় ০৫টির মধ্যে সর্বজনীন ০৩টি ও পারিবারিক ০২টি। দিরাই উপজেলায় মোট৬৫টি’র মধ্যে সর্বজনীন ৬৩টি ও পারিবারিক ০২টি। এর মধ্যে দিরাই পৌরএলাকায় সর্বজনীন ০৭টি। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় মোট ২৪টি’র মধ্যে সবগুলোই সর্বজনীন।জামালগঞ্জ উপজেলায় মোট ৪৯টি’র মধ্যে সবগুলোই সর্বজনীন।বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় মোট ৩০টি’র মধ্যে সবগুলোই সর্বজনীন।শাল্লা উপজেলায় মোট ৩০টি’র মধ্যে সবগুলোই সর্বজনীন।তাহিরপুর উপজেলায় মোট ২৯টি’র মধ্যে ২৭টি সর্বজনীন ও ০২টি পারিবারিক।দোয়ারাবাজার উপজেলায় মোট ১৮টি’র মধ্যে সবগুলোই সর্বজনীন।ধর্মপাশায় মোট ১৮টি’র মধ্যে সর্বজনীন-১৭টি ও পারিবারিক ০১টি। মধ্যনগর থানায় মোট ২৯টি’র মধ্যে সবগুলোই সর্বজনীন পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
সুনামগঞ্জ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্রীযোগেশ্বর দাশ বলেন,বন্যা ও বিশ্বব্যাপী করোনা প্রাদুর্ভাব এবারের দুর্গোৎসব অনেকটা ভিন্ন আঙ্গিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সবাই যেন যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মন্দিরে আসেন তা সবাইকে বলাও হয়েছে। এবারের করোনা প্রাদুর্ভাব থেকে গোটা পৃথিবীর মানুষের যেন মুক্তি মেলে মা দুর্গার কাছেই এবারের বিশেষ প্রার্থনা থাকবে।
সুনামগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট বিমান কান্তি রায় গতকাল জানান, পূজোর যাবতীয় উপকরণ, পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, চন্ডীপাঠ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সন্ধ্যা আরতী, ভজন কীর্ত্তন, আলোকসজ্জা ও ডেকোরেশনসহ নানান প্রস্তুতি শেষ। পূজা আয়োজনকারী প্রতিটি কমিটি ও পারিবারিক পূজা উদ্যোক্তারা নান্দনিক সুন্দর আয়োজনের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি বছর এই পূজাতে নতুন নতুন সাজ-সজ্জা চোখে পড়লেও এবার করোনা মহামারির কারণে কিছুটা ব্যতিক্রম । শারদীয় দুর্গোৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রতিবছরের মতো এবারও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে- জেলা প্রশাসক, পলিশ সুপার, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিসদ চেয়ারম্যান, সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পৃথক পৃথক সময়ে জেলা পূজা উদযাপন কমিটি বিভিন্ন মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার পূজা কমিটির নেতৃবৃন্দের সাথে পৃথক পৃথক মতবিনিময়সভা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করেন এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পূজা উদযাপন করতে আইন-শৃঙ্খলাসহ সার্বিক সহযোগিতার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সুনামগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্রী বিমল বণিক বলেন, জেলা প্রশাসক, পলিশ সুপার, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিসদ চেয়ারম্যান, সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পৃথক পৃথক সময়ে জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাথে পৃথক পৃথক মতবিনিময় সভা করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দুর্গোৎসব পালন করার জন্য যেসব দিক নির্দেশনা দিযেছেন, আমরা জেলার প্রত্যেকটি পূজা উদযাপনকারি সংগঠন,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মন্দির কমিটির সংশ্লিষ্ট সকলকে এমনকি পূজায় আগত দর্শনার্থীরা যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিক্রমা করেন সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য জেলার পূজা উদযাপনকারী সকল সংগঠনকে বলা হযেছে। করোনা মহামারি থেকে বিশ্ববাসীর মুক্তি কামনায় কেন্দ্রিয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশেষ প্রার্থনা সপ্তমী পূজার দিন দুপুর ১২টা ১মিনিটে জেলার পূজা উদযাপনকারি সকল ম-পে অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি আরোও বলেন, এবার শারদীয় উৎসব উপলক্ষে সুনামগঞ্জ শহরের বড় বড় বিপণিবিতানগুলোতে বিগত বছরগুলোর ন্যায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের তেমন ভিড় পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে লোকজন নতুন পোশাক ক্রয় করতে শহরের বিভিন্ন মার্কেটে তেমন ভিড় করছেন না। কেনাকাটা করলেও বিগত বছরগুলোর ন্যায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে দল বেঁধে মাকেৃটিং করতে যাচ্ছেন না।
উল্লেখ্য,সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়াদশমী নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় দেবীপক্ষ। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া। এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। গত মাসের ১৭ সেপ্টেম্বর বুধবার অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র মহালয়া। গতকাল ২১ অক্টোবর বুধবার মহাপঞ্চমী,আজ ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার মহাষষ্ঠী,আগামিকাল ২৩ অক্টোবর শুক্রবার মহাসপ্তমী, ২৪ অক্টোবর শনিবার মহাঅষ্টমী, ২৫ অক্টোবর রবিবার মহানবমী, ২৬ অক্টোবর সোমবার বিজয়া দশমীর মাধ্যমে শেষ হবে পূজার কার্যক্রম।

এই সংবাদটি 17 বার পঠিত হয়েছে