একসাথে ৪৭টি মামলার নজিরবিহীন রায়, ফুল হাতে বাড়ী ফিরলেন দু’পক্ষ।

প্রকাশিত: ২:৩২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৫, ২০২০


মিজানুর রহমান মিজান:  শাস্তি নয় শান্তি ও সম্পৃতির সুবাতাস এবং ফুলের সুগন্ধ বিলিয়ে মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে ৪৭টি পরিবারকে ভাঙ্গনের হাত হতে রক্ষা করে স্ত্রীকে স্বামীর নিকট, স্বামীকে স্ত্রীর নিকট এবং সন্তানদেরকে তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বাবা-মা উভয়ের সান্নিধ্য লাভের ব্যবস্থা করে দিলেন সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জনাব মো: জাকির হোসেন।
নির্যাতনের শিকার হয়ে এই ৪৭জন নারী তাদের স্বামীর বিরুদ্ধে নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেছিলেন। মামলার ফলে স্বামী-স্ত্রীর যুদ্ধংদেহী অবস্থানের কারনে তাদের সন্তানদের জীবন, নিরাপত্তা,খাদ্য, বাসস্থান, আদর-যতœ, ভালবাসা, ভূত-ভবিষ্যত সবই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ডুবেছিল। স্ত্রী স্বামীর গৃহ ছাড়া হয়ে সন্তানাদি নিয়ে এক অনিশ্চিত জীবনের পথে হাটছিলেন। সে অনিশ্চয়তার জীবন থেকে অনিশ্চিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে তার জীবনে,সংসারে,সমাজে,রাষ্ট্রে শান্তি ও সৌহার্দের এক পরিবেশ শুরু হল।
আদালতের এরূপ উদ্যোগের ফলে অন্যান্য স্বামী-স্ত্রী যারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে মামলা লড়ে যাচ্ছেন তারা এ পথ পরিহার করে শান্তির পথে আসতে উৎসাহী হবে।
গতকাল সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাকির হোসেন পারিবারিক নানা বিরোধের জেরে, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে করা ৪৭টি মামলার রায় দিয়েছেন। রায়ের পর ফুল হাতে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছেন এই ৪৭ দম্পতি। মামলা থেকে খালাস পেয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরেছেন অভিযুক্তরা। রায় ঘোষণার পর আদালতের কর্মীরা তাঁদের রজনীগন্ধাফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলাগুলো আপোষনামার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ায় আদালত সব আসামিকে খালাস দিয়েছেন। এতে করে স্বামীর ঘরে ফিরেছেন স্ত্রী। সন্তানদের কেউ কেউ ছিল মায়ের সঙ্গে, আবার কেউ বাবার সঙ্গে, এখন তারা মা–-বাবা দুজনের সঙ্গে থাকবেন। তবে এসব দম্পতিকে মানতে হবে ছয়টি শর্ত। এ ব্যাপারে উভয় পক্ষ আদালতে লিখিত আপোষনামা সম্পাদন করেছেন তাঁরা।
শর্তগুলো হলো: ১) স্বামী-স্ত্রী সন্তানাদি নিয়া পরিবারের অন্যান্যদের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে শান্তিপূর্ণভাবে সংসারধর্ম পালন করবে। ২) সংসারের শান্তি বিনষ্ঠ হয় ভবিষ্যতে এরকম কোনো কাজ করিবো না। ৩) স্ত্রী বা তাঁর পিতা-মাতা/অভিভাবকদের কাছে যৌতুক দাবী করিবনা। ৪) পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে কখন ও কোন মনোমালিন্য, বিরোধ দেখা দিলে নিজেরা আলাপ আলোচনা করে শান্তিপূর্ন সমাধান করিয়া সহাবস্থান করিবে। ৫) স্ত্রীকে কখনো নির্যাতন করিবো না। স্বামী স্ত্রীর উপর নির্যাতন করলে বা যৌতুক দাবী করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনে কোন বাধা থাকিবে না। ৬) মামলা আপোষসুত্রে নিস্পত্তি হইবে এবং আসামী মামলা হইতে খালাস পাইবে। উল্লেখিত শর্ত সমুহ মানিয়া চলতে উভয় পক্ষ স্বাক্ষর প্রদানের মাধ্যমে লিখিত অঙ্গীকার করেন।
রায় ঘোষণার পর বিচারক মো. জাকির হোসেন বলেন, মানুষের মধ্যে একটা ভুল ধারণা আছে যে, আইন-আদালত সৃষ্টি হয়েছে শুধু মানুষকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে। মানুষের এ ধারণাকে পাল্টে দেওয়ার জন্য আজকের এই রায়। আদালত যে শুধু শাস্তিই দেন না মানুষের মধ্যে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেয়, সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে দেয় এ রায়ের মাধ্যমে মানুষ সেটা অনুধাবন করতে পারবে। আজ এতগুলো পরিবার আবার একত্র হলো। স্বামী-স্ত্রীর এ মহা মিলনের রায়ে স্বামী যেমন স্ত্রী ফিরে পেল তেমনি স্ত্রী তার স্বামীকে। সন্তান ফিরে গেল তার নিরাপদ নীড়ে।
সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নান্টু রায় বলেন, এই রায় একটা নজির।আদালত নিজে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সহায়তায় এই মামলাগুলো অপোষে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছেন। সংসারে বিভিন্নভাবে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে নারীরা এসব মামলা করেছিলেন। মামলার কারণে পারিবারিক দ্বন্ধ-বিভেদ আরও বাড়ে। আদালতের ব্যতিক্রমী এ রায় সমাজে একটা ইতিবাচক বার্তা দেবে”।

এই সংবাদটি 178 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ