করোনাকালে বাউল শিল্পীরা বিপাকে

প্রকাশিত: ৪:১৫ অপরাহ্ণ, জুন ৫, ২০২১

হিমাদ্রি শেখর ভদ্র:

অনেকে গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে কিন্তু আমি শুধু গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। করোনা ভাইরাসের আগে আমি আদালত পাড়ায় খোলা আকাশের নীচে গান গেয়ে সংসার চালাতাম। করোনা আসার পর দীর্ঘ দুই বছর যাবত গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছিনা। পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে আমার দিন কাটছে। আমি কোন সরকারি সহায় সাহায্য পাইনি। এভাবে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার অন্ধ বাউল শিল্পী রিয়াজ উদ্দিন তার কষ্টের কথা গুলো বলছিলেন। এগুলো শুধু তার কথা নয় জেলার এক হাজার বাউল শিল্পীর কথা। শনিবার বিকেলে তিনি জেলা বাউল কল্যান সমিতির মতবিনিময় সভায় এসে তার দিনযাপনের গ্লানির কথা বলছিলেন। মতবিনিময় সভায় জেলার ১১ টি উপজেলার শতাধিক হতদরিদ্র বাউল শিল্পী অংশগ্রণ করেন। তারা জানান, ২০২০ সাল থেকে তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোন ওরস হয় না হয়না বাউল গানের আসর। শীত এলে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় শতশত বাউল শিল্পী বিভিন্ন আসরে গান গেয়ে জীবন জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু পরপর দুটি শীতকাল চলে গেছে তাদের আয়রোজগারের কোন ব্যবস্থা হয়নি। তাই অনেক কষ্টে দিন কাটছে তাদের। বাউল শিল্পী বীরমুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন বলেন, বাউলদের কোন জায়গা জমি নেই। গান গাওয়া ছাড়া বিকল্প কোন কাজ জানেন না তারা। প্রতি বছর শীত এলে একতারা, দোতারা, ঢোল, বেহালা, সারিন্দা নিয়ে গানের আসরে গান গেয়ে অর্থ উপার্জন করেন। করোনার জন্য তাদের আয়রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাউলদের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ না করলে বাউল গান ও বাউল শিল্পীদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। প্রবীণ অসুস্থ বাউল শিল্পী তছকির আলী বলেন, বাউল শিল্পীরা গানের উপর নির্ভরশীল। এখন গান নেই আসর নেই কোথাও গানের আসর বসে না কোথাও যাওয়া যায়না। বাউলরা বর্তমানে অসহায়ের মতো জীবন যাপন করছেন। সরকার যে শিল্পী ভাতা দেয় তা দিয়ে কিছুই হয় না। খুব কম সংখ্যক শিল্পী সরকারি ভাতা পান বেশির ভাগ শিল্পী ভাতার বাইরে রয়ে গেছেন। বাউল শিল্পী উদাসী মুজিব বলেন, গান ছাড়া আমাদের চলার কোন পথ নেই আমাদের কোন ক্ষেতকিষি নেই ব্যবসা বাণিজ্য নেই। গানের আসর ওরস মাহফিল যেখানে হয় সেখানেই আমাদের রিজিক থাকে। সব বাউলের একই কথা গান আর গান বাউলরা গান ভিন্ন আর কিছু জানেন না। তাই বাউলের প্রতি সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। বাউল বিরহী রিপা বলেন, জেলায় ৭০ থেকে ৮০ জন মহিলা বাউল শিল্পী রয়েছেন। পুরুষ বাউল শিল্পীদেও পাশাপাশি তারাও আসরে ওরসে গান পরিবেশন করে সংসার চালাতেন তাদেও আয়-রোজগার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বাউল শিল্পী লেচু আক্তার বলেন, সরকার শুনছি করোনার সময়ে কতজনরে কত ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন কিন্তু জেলার বেশির ভাগ বাউল শিল্পী এখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বাউল শিল্পী আব্দুল কাহার, আসদ আলী, তারা মিয়া মাস্টার আলতাব আলী, গীতিকার শফিকুল ইসলাম শফিক, গীতিকার হেলাল তালুকদার, আক্কল আলী, কবির উদ্দিন,দুলাল উদ্দিন সরকার,স্বাধীন আক্তার, আশিক ভান্ডারী, কবির উদ্দিন, সোহরাব আলী শুক্কুর আলী হারুন সরকার সহ মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহনকারী বাউল শিল্পীদের দাবি আগামী শীতকালে যেন জেলার বাউল শিল্পীরা স্বাস্থ্য বিধি মেনে গানের আসর করতে পারেন এবং শিল্পীদের করোনা কালীন ভাতার পরিমান ও সংখ্যা আরও বাড়ানোর দাবি করেন সরকারের কাছে। সুনামগঞ্জ জেলা বাউল কল্যান সমিতির সভাপতি বাউল শাহজাহান সিরাজ বলেন, সারা জেলায় এক হাজার হতদরিদ্র বাউল শিল্পী রয়েছেন তাদের মধ্যে সরকারি সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছেন মাত্র দুইশত জন বেশির ভাগ শিল্পী সরকারি ভাতা পান না। করোনা কালে গানবাজনা বন্ধ থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে তারা অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। বাউল শিল্পীদের জন্য সরকারের বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের দাবি করেন তিনি। সহ সভাপতি গীতিকার মোঃ আসাদ আলী আল মাইজভান্ডারী বলেন, সুনামগঞ্জ বাউলের জেলা এ জেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন হাছন রাজা, রাধারমণ দত্ত পুরকাস্থ, বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম, র্দূবীণ শাহসহ অনেক খ্যাতিমান শিল্পী। তাই অনেকটা উত্তরাধিকার সুত্রে সুনামগঞ্জে বাউল গানের চর্চা বেশি হয়। এজেলার বাউল সংস্কৃতি রক্ষা করতে সরকারি বেসরকারি ভাবে বাউলদের পৃষ্টপোষকতা করতে হবে। সংগঠনের সাধারন সম্পাদক বাউল আল হেলাল বলেন, অনেক বাউলদের থাকার মতো একটি ভালো বসতঘর নেই আবার অনেকের ঘর তৈরি জায়গা নেই। তারা অন্যেও বাড়িতে ঘর তৈরি করে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। বাউলদের জন্য সরকারি ভাবে ঘর প্রদানের দাবি জানান তিনি। শনিবার বিকেলে শহরের কালীবাড়ি এলাকায় পুরাতন শিল্পকলা একাডেমীর আব্দুল হাই মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত মত বিনিময় সভায় ভাতা বঞ্চিত বাউলরা ভাতা ও সরকারি ঘর প্রদানের দাবি করেন। মতবিনিময় সভায় সদর,দক্ষিণ সুনামগঞ্জ তাহিরপুর জামালগঞ্জসহ ১১ টি উপজেলার শতাধিক বাউল শিল্পী অংশগ্রহন করেন। জেলার ১১ টি উপজেলায় একহাজার বাউল শিল্পী রয়েছেন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই বৎসর যাবত কোন গানের আসর না হওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভাইরাসের সংক্রমনের কারণে তাদের পালাগান, আসরগান ওরস গান সহ সব ধরনের গান আসর বন্ধ রয়েছে। বাউল শিল্পীরা জানান, জেলার এক হাজার বাউল শিল্পীর মধ্যে ১৮৭ জন বাউল শিল্পী সরকারি ভাতা পেয়েছেন অধিকাংশ শিল্পী সরকারি ভাতা পাননি। জেলা কালচারেল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী বলেন, বাউল শিল্পীদের জন্য বিশেষ কোন প্রকল্প নেই। এপর্যন্ত ১৮৭ জন শিল্পীকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া আরও ৭০০ জন শিল্পীকে করোনাকালীন সময়ে বিভিন্ন সহযোগিতা করা হয়েছে। সরকার যদি বাউল শিল্পীদেও জন্য আলাদা কোন প্রকল্প গ্রহণ করেন তাহলে অবশ্যই তারা সহযোগিতা পাবেন।

এই সংবাদটি 79 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ