০৩:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ভাটি বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক সুখাইড় জমিদার বাড়ি

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড়-রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নে অবস্থিত প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন সুখাইড় জমিদার বাড়ি একসময় ভাটি বাংলার রাজমহল হিসেবে পরিচিত ছিল। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন এই রাজবাড়িটি বর্তমানে অবহেলা, অযত্ন ও সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। একসময়ের জৌলুশ হারিয়ে এখন ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছে, আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে আঙিনা, আর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ভাটি বাংলার গৌরবময় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোঘল শাসনামলে আনুমানিক ১৫৯১ সালে মহারাজা মহামাণিক্য দত্ত হুগলি থেকে আসাম যাওয়ার পথে কালিদহ সাগর এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সুখাইড়ে জায়গির ক্রয় করেন। পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরিদের উদ্যোগে এখানে রাজবাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ১৬৯৫ সালে জমিদার রাজীব রায় চৌধুরী, মোহনলাল রায় চৌধুরী ও কেশব রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রায় ২৫ একর জমির ওপর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং কয়েক প্রজন্মের প্রচেষ্টায় এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়।

জমিদারি আমলে সুনামগঞ্জ ৩২টি পরগনায় বিভক্ত ছিল। সুখাইড় জমিদারির বিস্তৃতি ছিল দক্ষিণে ঘাগলাজুর নদীর উত্তরপাড়, উত্তরে বংশীকুন্ডা, পশ্চিমে ধর্মপাশা এবং পূর্বে জামালগঞ্জ পর্যন্ত। জমিদারির অধীনে ছিল ২০টিরও বেশি জলমহাল। গজারিয়া নদীর উত্তরপাড় থেকে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই রাজ্যের সীমানা।

রাজবাড়িটিতে ছিল বাংলোঘর, কাচারিঘর, জলসাঘর, গুদামঘর, সদরমহল, অন্দরমহল, হাতিশাল, ঘোড়াশাল, খাসকামরা ও বিশাল পুকুর। সে সময় সুখাইড় রাজবাড়িতে রঙিন আলোর বাতির ব্যবহার ছিল, যখন তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে হারিকেনের আলো ব্যবহৃত হতো। এ থেকেই রাজবাড়ির ঐশ্বর্য ও আধুনিকতার পরিচয় মেলে।

লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, ব্রিটিশ আমলে এক ইংরেজ প্রশাসক বেলেন্টিয়ার টাঙ্গুয়ার হাওরে বাঘ শিকারে গিয়ে বিপদে পড়লে তৎকালীন জমিদার চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরী তিনটি বাঘ গুলি করে তাঁকে উদ্ধার করেন। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ওই ইংরেজ প্রশাসক তাঁকে একটি বন্দুক উপহার দেন।

জমিদার পরিবারের উত্তরাধিকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মহারাজা মহামাণিক্য দত্তের বংশধররাই পরবর্তীতে রায় চৌধুরী উপাধি গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে প্রজাস্বত্ব আইন পাসের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ১৯৫৬ সালে সুখাইড় জমিদারি এস্টেটে তা কার্যকর হয়। এরপর অধিকাংশ জমি সরকারের অধীনে চলে যায় এবং জমিদার পরিবারের আর্থিক অবস্থারও অবনতি ঘটে।

বর্তমানে রাজবাড়ির অধিকাংশ ভবন জরাজীর্ণ। অনেক স্থাপনা ধসে পড়েছে, আবার অনেকগুলো ধ্বংসের অপেক্ষায়। নিয়মিত সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি দিন দিন তার অস্তিত্ব হারাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ইতিহাস সচেতন মানুষের দাবি, সুখাইড় জমিদার বাড়িকে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ, সংস্কার এবং পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

অন্যথায়, ভাটি বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের এক অমূল্য নিদর্শন খুব শিগগিরই কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জনপ্রিয় পোস্ট

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ভাটি বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক সুখাইড় জমিদার বাড়ি

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ভাটি বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক সুখাইড় জমিদার বাড়ি

আপডেট সময় : ০২:৪৮:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড়-রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নে অবস্থিত প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন সুখাইড় জমিদার বাড়ি একসময় ভাটি বাংলার রাজমহল হিসেবে পরিচিত ছিল। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন এই রাজবাড়িটি বর্তমানে অবহেলা, অযত্ন ও সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। একসময়ের জৌলুশ হারিয়ে এখন ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছে, আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে আঙিনা, আর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ভাটি বাংলার গৌরবময় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোঘল শাসনামলে আনুমানিক ১৫৯১ সালে মহারাজা মহামাণিক্য দত্ত হুগলি থেকে আসাম যাওয়ার পথে কালিদহ সাগর এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সুখাইড়ে জায়গির ক্রয় করেন। পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরিদের উদ্যোগে এখানে রাজবাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ১৬৯৫ সালে জমিদার রাজীব রায় চৌধুরী, মোহনলাল রায় চৌধুরী ও কেশব রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রায় ২৫ একর জমির ওপর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং কয়েক প্রজন্মের প্রচেষ্টায় এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়।

জমিদারি আমলে সুনামগঞ্জ ৩২টি পরগনায় বিভক্ত ছিল। সুখাইড় জমিদারির বিস্তৃতি ছিল দক্ষিণে ঘাগলাজুর নদীর উত্তরপাড়, উত্তরে বংশীকুন্ডা, পশ্চিমে ধর্মপাশা এবং পূর্বে জামালগঞ্জ পর্যন্ত। জমিদারির অধীনে ছিল ২০টিরও বেশি জলমহাল। গজারিয়া নদীর উত্তরপাড় থেকে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই রাজ্যের সীমানা।

রাজবাড়িটিতে ছিল বাংলোঘর, কাচারিঘর, জলসাঘর, গুদামঘর, সদরমহল, অন্দরমহল, হাতিশাল, ঘোড়াশাল, খাসকামরা ও বিশাল পুকুর। সে সময় সুখাইড় রাজবাড়িতে রঙিন আলোর বাতির ব্যবহার ছিল, যখন তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে হারিকেনের আলো ব্যবহৃত হতো। এ থেকেই রাজবাড়ির ঐশ্বর্য ও আধুনিকতার পরিচয় মেলে।

লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, ব্রিটিশ আমলে এক ইংরেজ প্রশাসক বেলেন্টিয়ার টাঙ্গুয়ার হাওরে বাঘ শিকারে গিয়ে বিপদে পড়লে তৎকালীন জমিদার চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরী তিনটি বাঘ গুলি করে তাঁকে উদ্ধার করেন। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ওই ইংরেজ প্রশাসক তাঁকে একটি বন্দুক উপহার দেন।

জমিদার পরিবারের উত্তরাধিকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মহারাজা মহামাণিক্য দত্তের বংশধররাই পরবর্তীতে রায় চৌধুরী উপাধি গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে প্রজাস্বত্ব আইন পাসের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ১৯৫৬ সালে সুখাইড় জমিদারি এস্টেটে তা কার্যকর হয়। এরপর অধিকাংশ জমি সরকারের অধীনে চলে যায় এবং জমিদার পরিবারের আর্থিক অবস্থারও অবনতি ঘটে।

বর্তমানে রাজবাড়ির অধিকাংশ ভবন জরাজীর্ণ। অনেক স্থাপনা ধসে পড়েছে, আবার অনেকগুলো ধ্বংসের অপেক্ষায়। নিয়মিত সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি দিন দিন তার অস্তিত্ব হারাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ইতিহাস সচেতন মানুষের দাবি, সুখাইড় জমিদার বাড়িকে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ, সংস্কার এবং পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

অন্যথায়, ভাটি বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের এক অমূল্য নিদর্শন খুব শিগগিরই কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।