১১:৫০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতি যখন সম্মান পায়: সমাজ কোথায় দাঁড়িয়ে?

সমাজের নৈতিক ভাঙন কখনও হঠাৎ করে ঘটে না; তা গড়ে ওঠে সময়ের স্রোতে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে, মূল্যবোধের ধস নামায়। অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদের সাম্প্রতিক মন্তব্য—যে একসময় দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষকে সমাজ ঘৃণা করত, বিয়ে পর্যন্ত দিত না, অথচ এখন তাদের প্রতি সম্মান ও আগ্রহ দেখানো হয়—যা আমাদের পুরো সামাজিক সংকটকে এক বাক্যে তুলে ধরে।

এক সময় সমাজে একটি শক্ত নৈতিক চাপ লক্ষনীয় ছিল। সুদখোর মহাজন, মদ্যপ, চাঁদাবাজ, ঘুষখোর বা সাদা কলারের দুর্নীতিবাজদের পরিবারও লজ্জায় মাথা তুলতে পারত না। তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা ছিল সামাজিক অপমানের সমান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই সামাজিক প্রতিরোধই ছিল নীতি-নৈতিকতার সবচেয়ে বড় প্রহরী।

কিন্তু, আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। সমাজ এখন দুর্নীতিকে শুধু সহ্যই করে না, বরং তাকে পুরস্কৃতও করে। যে মানুষ অবৈধভাবে সম্পদ গড়ে, ক্ষমতার দম্ভ দেখায়, সম্পর্ক–চক্রে আধিপত্য কায়েম করে—তার বাড়িতেই এখন সবচেয়ে বেশি মানুষের ভিড় দেখা যায়। ছেলে-মেয়ের বিয়ের জন্য এমন বাড়ি এখন “প্রতিযোগিতার কেন্দ্র”। ঘুষখোর কর্মকর্তার নতুন বাড়িতে অভ্যর্থনার ভিড়, চাঁদাবাজ নেতার দান অনুষ্ঠান, সুদখোর ব্যবসায়ীর দাতব্য ইমেজ—সব মিলিয়ে আজ দুর্নীতি লাভজনক, আর সততা পরিণত হয়েছে ‘বোকামিতে’।

সমস্যা শুধু দুর্নীতিবাজদের আচরণে নয়; সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও দেখা যায়! আমরা মানবিক গুণের মূল্য দিতে ভুলে গেছি এবং অবৈধ উপার্জনের সামনে নতজানু হয়ে পড়েছি! সমাজ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা হারিয়ে ফেলে, তখন দুর্নীতিকে রোধ করার সব রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়। শক্ত আইন থাকা বলবৎ থাকা সত্বেও সামাজিক নৈতিকতা ভেঙে গেলে দুর্নীতিবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের। তারা দেখছে—সৎ থাকার কোনো সুযোগ নেই, ত্যাগের কোনো মূল্য নেই, আর পরিশ্রমের পথটি সবথেকে দীর্ঘ। ফলে তাদের সামনে রোল মডেল হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঘুষ, দুর্নীতি, অবৈধ লেনদেনকারী, ধর্মের অপব্যবহারকারী, ক্ষমতার চাপে ব্যবসা করা ব্যক্তিরা। এভাবে সমাজ ধীরে ধীরে এমন একটি স্থানে চলে যাচ্ছে, যেখানে ন্যায়–অন্যায়, সৎ–অসৎ, পাপ–পুণ্যের পার্থক্যটাই মুছে যাচ্ছে।

আমাদের বুঝতে হবে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক কাঠামো—সব জায়গায় সততার মূল্যায়ন ফিরিয়ে আনতে হবে। ঘুষখোর, চাঁদাবাজ, সুদখোর বা দুর্নীতিবাজদের প্রতি সামাজিক প্রত্যাখ্যান আবার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

যে সমাজ দুর্নীতিকে মর্যাদা দেয়, সে সমাজ কখনও টেকসই উন্নয়ন, শান্তি বা ন্যায়বিচার অর্জন করতে পারে না। যারা অন্যায় করে, সমাজ তাদের প্রতি নীরব প্রশ্রয় দিলে সেই সমাজের দুর্বলরা, গরিবরা, সৎ কর্মীরা সবচেয়ে বেশি নিষ্পেষিত হয়।

এখনই সময় আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর। প্রশ্ন করার সময় এসেছে—আমরা কোন সমাজ চাই? দুর্নীতিকে সম্মান দেওয়া সমাজ, নাকি সততাকে মর্যাদা দেওয়া সমাজ?

পরিশেষে, রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইন যত কঠোরই হোক, সমাজ যদি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, তবে দুর্নীতি নির্মূল হবে না কখনোই। তাই প্রথমে বদলাতে হবে মনোভাব। ফিরিয়ে আনতে হবে সেই পুরোনো সামাজিক ঘৃণা, যে ঘৃণা একসময় দুর্নীতিকে লজ্জিত করত।

মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সুস্থ সমাজ গড়তে হলে দুর্নীতিবাজদের প্রতি নয়—সততার প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনাটাই আজ সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

মোঃ জাকারিয়া জামান
সম্পাদক ও প্রকাশক
সমাজবার্তা

জনপ্রিয় পোস্ট

সুনামগঞ্জে ৪৪৪ মণ্ডপে দুর্গাপূজা সম্পন্ন, প্রতিমা বিসর্জনে বিদায় দেবী দুর্গার

দুর্নীতি যখন সম্মান পায়: সমাজ কোথায় দাঁড়িয়ে?

আপডেট সময় : ০৯:৫৭:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

সমাজের নৈতিক ভাঙন কখনও হঠাৎ করে ঘটে না; তা গড়ে ওঠে সময়ের স্রোতে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে, মূল্যবোধের ধস নামায়। অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদের সাম্প্রতিক মন্তব্য—যে একসময় দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষকে সমাজ ঘৃণা করত, বিয়ে পর্যন্ত দিত না, অথচ এখন তাদের প্রতি সম্মান ও আগ্রহ দেখানো হয়—যা আমাদের পুরো সামাজিক সংকটকে এক বাক্যে তুলে ধরে।

এক সময় সমাজে একটি শক্ত নৈতিক চাপ লক্ষনীয় ছিল। সুদখোর মহাজন, মদ্যপ, চাঁদাবাজ, ঘুষখোর বা সাদা কলারের দুর্নীতিবাজদের পরিবারও লজ্জায় মাথা তুলতে পারত না। তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা ছিল সামাজিক অপমানের সমান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই সামাজিক প্রতিরোধই ছিল নীতি-নৈতিকতার সবচেয়ে বড় প্রহরী।

কিন্তু, আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। সমাজ এখন দুর্নীতিকে শুধু সহ্যই করে না, বরং তাকে পুরস্কৃতও করে। যে মানুষ অবৈধভাবে সম্পদ গড়ে, ক্ষমতার দম্ভ দেখায়, সম্পর্ক–চক্রে আধিপত্য কায়েম করে—তার বাড়িতেই এখন সবচেয়ে বেশি মানুষের ভিড় দেখা যায়। ছেলে-মেয়ের বিয়ের জন্য এমন বাড়ি এখন “প্রতিযোগিতার কেন্দ্র”। ঘুষখোর কর্মকর্তার নতুন বাড়িতে অভ্যর্থনার ভিড়, চাঁদাবাজ নেতার দান অনুষ্ঠান, সুদখোর ব্যবসায়ীর দাতব্য ইমেজ—সব মিলিয়ে আজ দুর্নীতি লাভজনক, আর সততা পরিণত হয়েছে ‘বোকামিতে’।

সমস্যা শুধু দুর্নীতিবাজদের আচরণে নয়; সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও দেখা যায়! আমরা মানবিক গুণের মূল্য দিতে ভুলে গেছি এবং অবৈধ উপার্জনের সামনে নতজানু হয়ে পড়েছি! সমাজ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা হারিয়ে ফেলে, তখন দুর্নীতিকে রোধ করার সব রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়। শক্ত আইন থাকা বলবৎ থাকা সত্বেও সামাজিক নৈতিকতা ভেঙে গেলে দুর্নীতিবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের। তারা দেখছে—সৎ থাকার কোনো সুযোগ নেই, ত্যাগের কোনো মূল্য নেই, আর পরিশ্রমের পথটি সবথেকে দীর্ঘ। ফলে তাদের সামনে রোল মডেল হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঘুষ, দুর্নীতি, অবৈধ লেনদেনকারী, ধর্মের অপব্যবহারকারী, ক্ষমতার চাপে ব্যবসা করা ব্যক্তিরা। এভাবে সমাজ ধীরে ধীরে এমন একটি স্থানে চলে যাচ্ছে, যেখানে ন্যায়–অন্যায়, সৎ–অসৎ, পাপ–পুণ্যের পার্থক্যটাই মুছে যাচ্ছে।

আমাদের বুঝতে হবে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক কাঠামো—সব জায়গায় সততার মূল্যায়ন ফিরিয়ে আনতে হবে। ঘুষখোর, চাঁদাবাজ, সুদখোর বা দুর্নীতিবাজদের প্রতি সামাজিক প্রত্যাখ্যান আবার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

যে সমাজ দুর্নীতিকে মর্যাদা দেয়, সে সমাজ কখনও টেকসই উন্নয়ন, শান্তি বা ন্যায়বিচার অর্জন করতে পারে না। যারা অন্যায় করে, সমাজ তাদের প্রতি নীরব প্রশ্রয় দিলে সেই সমাজের দুর্বলরা, গরিবরা, সৎ কর্মীরা সবচেয়ে বেশি নিষ্পেষিত হয়।

এখনই সময় আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর। প্রশ্ন করার সময় এসেছে—আমরা কোন সমাজ চাই? দুর্নীতিকে সম্মান দেওয়া সমাজ, নাকি সততাকে মর্যাদা দেওয়া সমাজ?

পরিশেষে, রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইন যত কঠোরই হোক, সমাজ যদি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, তবে দুর্নীতি নির্মূল হবে না কখনোই। তাই প্রথমে বদলাতে হবে মনোভাব। ফিরিয়ে আনতে হবে সেই পুরোনো সামাজিক ঘৃণা, যে ঘৃণা একসময় দুর্নীতিকে লজ্জিত করত।

মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সুস্থ সমাজ গড়তে হলে দুর্নীতিবাজদের প্রতি নয়—সততার প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনাটাই আজ সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

মোঃ জাকারিয়া জামান
সম্পাদক ও প্রকাশক
সমাজবার্তা