০২:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুনামগঞ্জের টেকসই উন্নয়ন: প্রয়োজন সমন্বিত ও অভিন্ন নীতিমালা

  • সম্পাদকীয়
  • আপডেট সময় : ০৭:০৯:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
  • 9

সুনামগঞ্জের টেকসই উন্নয়ন এবং হাওরাঞ্চলের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি সুরক্ষায় একটি সমন্বিত ও অভিন্ন নীতিমালার গুরুত্ব অপরিসীম। ভাটি বাংলার প্রাণকেন্দ্র সুনামগঞ্জ জেলা একদিকে যেমন অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশাল হাওর, বিস্তৃত জলাভূমি, ধান উৎপাদনে অসামান্য অবদান এবং মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য এই জেলাকে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

অথচ একটি উপযুক্ত সমন্বিত কাঠামোর অভাবে এখানকার অপার সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। জেলাটির প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি একটি অভিন্ন ও টেকসই উন্নয়ন নীতি।বর্তমানে সুনামগঞ্জে যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক সমাধান নির্ভর। সঠিক পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে নির্মিত সড়ক বা বাঁধ অনেক সময় হাওরের স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে, যার ফলে অকাল বন্যা বা স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং পরিবেশ বিভাগের কাজের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সমন্বয়ের বেশ অভাব চোখে পড়ে।

টেকসই অবকাঠামোর বদলে কেবল মৌসুমি ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামতের মতো সাময়িক পদক্ষেপের ওপর নির্ভরতার কারণে প্রতি বছর বিপুল অর্থের অপচয় ঘটছে।হাওরাঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষের জীবনধারা দেশের অন্যান্য সমতল ভূখ-ের চেয়ে একদম আলাদা। তাই সাধারণ কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা সুনামগঞ্জের জন্য কার্যকর হতে পারে না। একটি বিশেষ ও অভিন্ন নীতিমালা থাকলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সেই সাথে এর সাথে শিক্ষার আধুনিকায়নকে যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

হাওরাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কথা মাথায় রেখে একটি হাওরবান্ধব শিক্ষা বর্ষপঞ্জি ও শিক্ষা অবকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। বর্ষায় আফাল আর শুষ্ক মৌসুমে যাতায়াতের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার অভাবে শিশুরা যেন পড়ালেখা থেকে পিছিয়ে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রেখে আধুনিক ও বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

পাশাপাশি স্থানীয় যুবসমাজকে হাওরভিত্তিক কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশবান্ধব কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে পারলে স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হবে।হাওরকে বাদ দিয়ে বা প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে সুনামগঞ্জের উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়, বরং প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই টেকসই কৌশল সাজাতে হবে। এর জন্য পূর্বঘোষিত হাওর মহাপরিকল্পনার যুগোপযোগী ও বাধ্যতামূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার। নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক, জেলে, হাওর গবেষক এবং শিক্ষকদের মতামতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

একই সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও শিক্ষা কার্যাক্রম অব্যাহত রাখতে জেলাভিত্তিক বিশেষ তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। সুনামগঞ্জকে কেবল শস্য কিংবা মৎস্য ভান্ডার হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত উন্নয়ন নীতিই পারে সুনামগঞ্জের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে, কারণ সুনামগঞ্জের হাওর ও শিক্ষা ব্যবস্থা বাঁচলে সমৃদ্ধ হবে পুরো বাংলাদেশ।

জনপ্রিয় পোস্ট

মহুরুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষ্যে জেলা বিএনপির দোয়া ও মিলাদ মাহফিল

সুনামগঞ্জের টেকসই উন্নয়ন: প্রয়োজন সমন্বিত ও অভিন্ন নীতিমালা

আপডেট সময় : ০৭:০৯:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

সুনামগঞ্জের টেকসই উন্নয়ন এবং হাওরাঞ্চলের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি সুরক্ষায় একটি সমন্বিত ও অভিন্ন নীতিমালার গুরুত্ব অপরিসীম। ভাটি বাংলার প্রাণকেন্দ্র সুনামগঞ্জ জেলা একদিকে যেমন অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশাল হাওর, বিস্তৃত জলাভূমি, ধান উৎপাদনে অসামান্য অবদান এবং মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য এই জেলাকে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

অথচ একটি উপযুক্ত সমন্বিত কাঠামোর অভাবে এখানকার অপার সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। জেলাটির প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি একটি অভিন্ন ও টেকসই উন্নয়ন নীতি।বর্তমানে সুনামগঞ্জে যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক সমাধান নির্ভর। সঠিক পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে নির্মিত সড়ক বা বাঁধ অনেক সময় হাওরের স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে, যার ফলে অকাল বন্যা বা স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং পরিবেশ বিভাগের কাজের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সমন্বয়ের বেশ অভাব চোখে পড়ে।

টেকসই অবকাঠামোর বদলে কেবল মৌসুমি ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামতের মতো সাময়িক পদক্ষেপের ওপর নির্ভরতার কারণে প্রতি বছর বিপুল অর্থের অপচয় ঘটছে।হাওরাঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষের জীবনধারা দেশের অন্যান্য সমতল ভূখ-ের চেয়ে একদম আলাদা। তাই সাধারণ কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা সুনামগঞ্জের জন্য কার্যকর হতে পারে না। একটি বিশেষ ও অভিন্ন নীতিমালা থাকলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সেই সাথে এর সাথে শিক্ষার আধুনিকায়নকে যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

হাওরাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কথা মাথায় রেখে একটি হাওরবান্ধব শিক্ষা বর্ষপঞ্জি ও শিক্ষা অবকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। বর্ষায় আফাল আর শুষ্ক মৌসুমে যাতায়াতের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার অভাবে শিশুরা যেন পড়ালেখা থেকে পিছিয়ে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রেখে আধুনিক ও বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

পাশাপাশি স্থানীয় যুবসমাজকে হাওরভিত্তিক কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশবান্ধব কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে পারলে স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হবে।হাওরকে বাদ দিয়ে বা প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে সুনামগঞ্জের উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়, বরং প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই টেকসই কৌশল সাজাতে হবে। এর জন্য পূর্বঘোষিত হাওর মহাপরিকল্পনার যুগোপযোগী ও বাধ্যতামূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার। নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক, জেলে, হাওর গবেষক এবং শিক্ষকদের মতামতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

একই সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও শিক্ষা কার্যাক্রম অব্যাহত রাখতে জেলাভিত্তিক বিশেষ তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। সুনামগঞ্জকে কেবল শস্য কিংবা মৎস্য ভান্ডার হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত উন্নয়ন নীতিই পারে সুনামগঞ্জের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে, কারণ সুনামগঞ্জের হাওর ও শিক্ষা ব্যবস্থা বাঁচলে সমৃদ্ধ হবে পুরো বাংলাদেশ।