কড়া রোদ আর ভ্যাপসা গরমের মধ্যে দেশের গ্রামে-গঞ্জে ও শহরাঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিং আবার নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘ঘণ্টায় ঘণ্টায়’ কিংবা দিনে বহুবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এখন আর কোনো সাধারণ সমস্যা নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং সার্বিক অর্থনীতিকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করছে।
বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার যে নাগরিক অধিকার মানুষের রয়েছে, সেখানে ঘন ঘন এই অচলাবস্থা জনমনে তীব্র অস্বস্তি ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং কেবল অন্ধকার আর গরম সহ্য করার বিষয় নয়—এর প্রভাব বহুস্তরে বিস্তৃত। তীব্র গরমে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে, বয়োবৃদ্ধরা ভুগছেন নানা শারীরিক জটিলতায়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে কর্মজীবী মানুষের কাজের উৎপাদনশীলতা কমছে। এইচএসসি বা বিভিন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মোমের আলো কিংবা আইপিএসের ওপর ভরসা রাখা অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।
হাসপাতালের আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার কিংবা জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অনুপস্থিতি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ক্ষুদ্র দোকানদার থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা—সবখানেই উৎপাদনে ধস নেমেছে। জেনারেটর চালিয়ে বাড়তি খরচে উৎপাদন বজায় রাখতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মূলত জ্বালানি সংকট (গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সঠিক সরবরাহ না থাকা) এবং ব্যবস্থাপনাগত নানা ত্রুটির কারণেই আজ সাধারণ গ্রাহকদের এই মাশুল গুনতে হচ্ছে।
বিশেষ করে শহর কিংবা মফস্বল এলাকায় বারবার লোডশেডিং নির্দেশ করে যে, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে সঠিক সামঞ্জস্য বজায় রাখতে গিয়ে কেবল ‘বিতরণ বন্ধ রাখা’র সহজ পথটিকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।বিদ্যুৎ এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মৌলিক অধিকার এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
বিদ্যুৎ খাতের এই অস্থিতিশীলতা নিরসনে দ্রুত ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।কোনো কারণে লোডশেডিং করতে বাধ্য হলেও তা যেন গ্রাহকদের আগাম জানিয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে করা হয়, যাতে মানুষ পূর্বপ্রস্তুতি নিতে পারে।
হুটহাট ও অনিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ করা বন্ধ করতে হবে। শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য ও বিকল্প শক্তির উৎসে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানো আবশ্যক। অসহ্য গরমের মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ের এই যন্ত্রণা সাধারণ মানুষের ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা করছে। জনজীবনের এই স্থবিরতা ও অস্বস্তি দূর করতে বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের আকুল দাবি—শুধুই সাময়িক আশ্বাস না দিয়ে বিদ্যুৎ খাতের প্রকৃত সংকট চিহ্নিত করে দ্রুত ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা হোক।
সম্পাদকীয় 


















