১১:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিপন্ন হাওর, বিপন্ন ভবিষ্যৎ: জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দরকার অবিলম্ব সমন্বিত পদক্ষেপ

  • সম্পাদকীয়
  • আপডেট সময় : ০৫:৪৩:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 9

হাওর কেবল চোখ জুড়ানো বিস্তৃত জলরাশি বা বিপুল মৎস্য ভা-ারই নয়, এটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য, অর্থনীতি ও এক অনন্য বাস্তুতন্ত্রের প্রণেতা। প্রতিবছর এই বিশাল জলাভূমি দেশজ প্রোটিনের বিপুল জোগান দেওয়ার পাশাপাশি আশ্রয় দেয় বহু প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখি, জলজ প্রাণী ও দুর্লভ উদ্ভিদকে।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অপরিকল্পিত মানব কর্মকা-, উজান থেকে আসা পলি, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার ও প্রশাসনিক শিথিলতার কারণে আজ হাওরের এই পরিবেশব্যবস্থা এক চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি।হাওরের জীববৈচিত্র্য বিনাশের প্রধান কারণগুলোর অন্যতম হলো ক্ষতিকর ও অবৈধ উপায়ে মাছ ধরা।

শুষ্ক মৌসুমে সেচযন্ত্র দিয়ে নদী ও কুড়ের পানি একবারে শুকিয়ে মাছ ধরা এবং নিষিদ্ধ কারেন্ট, চট ও মশারি জালের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে দেশি মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি, বিষটোপ ও ফাঁদ পেতে পাখি শিকারের কারণে টাঙ্গুয়ার হাওর বা হাকালুকি হাওরের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর পরিবেশগত সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তদুপরি, নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আটকে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং কৃষিজমিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত কীটনাশক ধুয়ে হাওরের পানিতে মেশায় জলজ প্রাণিকুল বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে।

এই বিপর্যয় থেকে হাওরকে রক্ষা করতে হলে ফাঁকা সনাতনী নীতি পরিহার করে বাস্তবমুখী কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া আবশ্যক। প্রথমত, হাওরের গভীরতম অংশগুলোকে স্থায়ী ‘মাদার ফিশারিজ’ বা মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে নিশ্চিত করে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সব ধরনের মৎস্য আহরণ কঠোরভাবে বন্ধ রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অবৈধ জালের বাজার ও ব্যবহার বন্ধে মৎস্য ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনর্গঠনে হিজল, করচ ও বরুণ বনের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদী বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তবে যেকোনো টেকসই সমাধানের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণের মূলে রাখতে হবে।

মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধের দিনগুলোতে হাওড়পাড়ের প্রান্তিক জেলে ও কৃষকদের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা বলয় ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে আইন প্রয়োগের সফলতা আসবে না। হাওর রক্ষা কেবল জলজ প্রাণীর অস্তিত্বের প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও বাস্তুতাত্ত্বিক ভারসাম্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সুতরাং, আর কালক্ষেপণ না করে হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিবেশবিদ ও স্থানীয় প্রশাসনকে অনতিবিলম্বে সমন্বিত রোডম্যাপ নিয়ে মাঠে নামতে হবে।

জনপ্রিয় পোস্ট

শান্তিগঞ্জে বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না, মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে গ্রাহকের ক্ষোভ

বিপন্ন হাওর, বিপন্ন ভবিষ্যৎ: জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দরকার অবিলম্ব সমন্বিত পদক্ষেপ

আপডেট সময় : ০৫:৪৩:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হাওর কেবল চোখ জুড়ানো বিস্তৃত জলরাশি বা বিপুল মৎস্য ভা-ারই নয়, এটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য, অর্থনীতি ও এক অনন্য বাস্তুতন্ত্রের প্রণেতা। প্রতিবছর এই বিশাল জলাভূমি দেশজ প্রোটিনের বিপুল জোগান দেওয়ার পাশাপাশি আশ্রয় দেয় বহু প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখি, জলজ প্রাণী ও দুর্লভ উদ্ভিদকে।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অপরিকল্পিত মানব কর্মকা-, উজান থেকে আসা পলি, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার ও প্রশাসনিক শিথিলতার কারণে আজ হাওরের এই পরিবেশব্যবস্থা এক চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি।হাওরের জীববৈচিত্র্য বিনাশের প্রধান কারণগুলোর অন্যতম হলো ক্ষতিকর ও অবৈধ উপায়ে মাছ ধরা।

শুষ্ক মৌসুমে সেচযন্ত্র দিয়ে নদী ও কুড়ের পানি একবারে শুকিয়ে মাছ ধরা এবং নিষিদ্ধ কারেন্ট, চট ও মশারি জালের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে দেশি মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি, বিষটোপ ও ফাঁদ পেতে পাখি শিকারের কারণে টাঙ্গুয়ার হাওর বা হাকালুকি হাওরের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর পরিবেশগত সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তদুপরি, নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আটকে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং কৃষিজমিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত কীটনাশক ধুয়ে হাওরের পানিতে মেশায় জলজ প্রাণিকুল বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে।

এই বিপর্যয় থেকে হাওরকে রক্ষা করতে হলে ফাঁকা সনাতনী নীতি পরিহার করে বাস্তবমুখী কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া আবশ্যক। প্রথমত, হাওরের গভীরতম অংশগুলোকে স্থায়ী ‘মাদার ফিশারিজ’ বা মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে নিশ্চিত করে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সব ধরনের মৎস্য আহরণ কঠোরভাবে বন্ধ রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অবৈধ জালের বাজার ও ব্যবহার বন্ধে মৎস্য ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনর্গঠনে হিজল, করচ ও বরুণ বনের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদী বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তবে যেকোনো টেকসই সমাধানের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণের মূলে রাখতে হবে।

মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধের দিনগুলোতে হাওড়পাড়ের প্রান্তিক জেলে ও কৃষকদের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা বলয় ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে আইন প্রয়োগের সফলতা আসবে না। হাওর রক্ষা কেবল জলজ প্রাণীর অস্তিত্বের প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও বাস্তুতাত্ত্বিক ভারসাম্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সুতরাং, আর কালক্ষেপণ না করে হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিবেশবিদ ও স্থানীয় প্রশাসনকে অনতিবিলম্বে সমন্বিত রোডম্যাপ নিয়ে মাঠে নামতে হবে।