সুনামগঞ্জ শহর কি এবার সত্যিই যানজট ও দখলের অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে? নাকি প্রতিবারের মতো কয়েক দিনের অভিযান শেষে আবারও ফিরবে সেই পুরোনো চিত্র—সড়কে অটো-রিকশার জট, ফুটপাতজুড়ে দোকানপাট আর পথচারীদের দুর্ভোগ?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন নগরবাসী। কারণ এবার শুধু অভিযান নয়, নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে সুনামগঞ্জ পৌর প্রশাসন।
পৌর শহরের যানজট নিরসন এবং সড়ক-ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চলমান অভিযানে জব্দ করা ২০টি অটো-রিকশা ও ৫০টি রিকশা জরিমানা আদায়ের পর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এসব যানবাহন আলফাত স্কয়ার ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলাচল করতে পারবে না।পৌর প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে একদিকে স্বস্তি ফিরেছে নগরবাসীর মধ্যে, অন্যদিকে জীবিকার প্রশ্নে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বৈধ যানবাহনের চালকেরা। তবে পৌর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পরিষ্কার—নিবন্ধন ও নিয়মের বাইরে গিয়ে শহরের সড়ক দখল করে চলাচলের সুযোগ আর দেওয়া হবে না।
একদিনের অভিযান নয়, চলবে নিয়মিত অভিযান গত মঙ্গলবার দুপুরে প্রায় ৭০ জন চালক জব্দ করা যানবাহন ছাড়ার দাবিতে পৌরসভা ভবনের সামনে জড়ো হন। পরে পৌর প্রশাসনের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়। আলোচনার পর জরিমানা আদায় সাপেক্ষে জব্দ করা যানবাহন ছাড়ার সিদ্ধান্ত হলেও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে দেওয়া হয় কঠোর শর্ত।
পৌর প্রশাসক অসীম চন্দ্র বণিক বলেন, একদিন অভিযান চালিয়ে থেমে গেলে যানজট ও ফুটপাত দখলের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাই নিয়মিত নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
অনিবন্ধিত ও লাইসেন্সবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও তিনি কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তাঁর ভাষ্য, আগে থেকেই মাইকিং করে চালকদের সতর্ক করা হয়েছে। এরপরও নিয়ম না মেনে শহরে চলাচলকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
‘নিবন্ধনের বাইরে গাড়ি পেলেই জব্দ’ পৌর প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—নিবন্ধনের বাইরে কোনো যানবাহন শহরে পাওয়া গেলে তা জব্দ করা হবে।
এ ঘোষণা বাস্তবায়ন করা গেলে শহরের সড়কে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের চাপ কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে বৈধ ও নিবন্ধিত যানবাহনের চালকদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রাখাও জরুরি।
জেলা ইজিবাইক সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, পৌরসভায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩০০। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে নষ্ট বা মেরামতের জন্য ২০০ থেকে ৩০০টি যানবাহন গ্যারেজে থাকে। ফলে নিবন্ধিত মোট সংখ্যার তুলনায় বাস্তবে শহরের সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা কম বলে দাবি তাদের।
সমিতির নেতাদের বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ—পৌরসভার নিবন্ধনের বাইরে কোনো অটো-রিকশা চলাচল করলে তা জব্দে তাদের আপত্তি নেই। তবে বৈধ চালকদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। ফুটপাত কি এবার পথচারীদের হবে?
শুধু যানবাহন নয়, ফুটপাত ও সড়ক দখল করে ব্যবসার বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে পৌর প্রশাসন।পৌর প্রশাসক অসীম চন্দ্র বণিক বলেছেন, দরিদ্র কোনো ব্যবসায়ী সীমিত পরিমাণ পণ্য নিয়ে বসলে মানবিক বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। কিন্তু একই ব্যক্তি নিয়মিতভাবে বিপুল পরিমাণ পণ্য নিয়ে সড়ক দখল করে ব্যবসা করলে এর পেছনে অন্য কোনো ব্যবসায়ী কিংবা বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমস্যার গভীরতা। কারণ ফুটপাত দখল শুধু পথচারীর চলাচল বন্ধ করে না; অনেক ক্ষেত্রে তা শহরের যানজটকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অভিযান হোক ধারাবাহিক, ব্যবস্থা হোক সবার জন্য সমান সুনামগঞ্জ শহরের যানজট ও দখল কোনো একদিনের সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন, ফুটপাত দখল এবং সড়কের ওপর ব্যবসা পরিচালনার কারণে নগরবাসী ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।তাই এবার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অভিযানের ধারাবাহিকতা।
কয়েকদিন কঠোর অভিযান চালিয়ে পরে সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে গেলে কোনো উদ্যোগই কার্যকর হবে না। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দরকার কোনো পক্ষপাত নয়, সবার জন্য একই নিয়ম।নগরবাসীর প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়—সড়ক হবে চলাচলের জন্য, ফুটপাত হবে পথচারীর জন্য এবং শহরে চলবে কেবল বৈধ ও নিবন্ধিত যানবাহন।
এখন দেখার বিষয়, পৌরসভার এই কঠোর ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়। কারণ সুনামগঞ্জবাসী আর আশ্বাস নয়—তারা দেখতে চান যানজটমুক্ত, দখলমুক্ত ও শৃঙ্খলিত একটি শহর।
স্টাফ রিপোর্টার: 


















