সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সংসারের অভাব মুছাতে কম টাকায় অবৈধ উপায়ে স্বপ্নের দেশ ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে ৬ যুবকের কোনো সন্ধান মিলছে না। অনেক পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মৃত্যু খবর নিয়ে নিউজ আসলেও সঠিক কিনা তা নিয়ে আলোচনা ঝড় বইছে। মাঝে মধ্যে খবর আসে মৃত্যু আবার কেউ জানান জীবিত রয়েছেন।
এদিকে নিখোঁজদের স্বজনেরা দিন-রাত উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। কেউই জানেন না তাদের সন্তান বেঁচে আছে কিনা। নিখোঁজ যুবকেরা হলেন, উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বাঘময়না গ্রামের আখল মিয়ার ছেলে জুয়েল আহমদ টিপু (২৩), একই ইউনিয়নের গন্ধর্বপুর গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে হাবিব উল্লাহ (২৮), কলকলিয়া ইউনিয়নের হিজলা গ্রামের ছালিক মিয়ার ছেলে ইউসুফ আলী (২০), সৈয়দপুর-শাহারপাড়া ইউনিয়নের কুড়িকেয়ার গ্রামের মৃত আব্দুল কদ্দুছের ছেলে সায়েক মিয়া (২৪) ও চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া (মরল বাড়ী) গ্রামের জম্মাত আলী ছেলে রুবেল মিয়া (৩৫) ও পৌরসভার ভবানীপুর গ্রামের সাইফু মিয়া (২৬)।
স্থানীয়রা জানান, নিখোঁজ ওই যুবকদের বিদেশ পাঠাতে আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের সাথে জনপ্রতি ১২ থেকে ১৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়। গত ৫ মাস আগে রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ইছগাঁও গ্রামের চিহ্ন দালাল আজিজের মাধ্যমে ১২ লাখ ৩০ হাজার টাকা চুক্তিতে লিবিয়া হয়ে গ্রিসে পৌঁছে দেওয়ার কথা হয় গন্ধর্বপুর গ্রামের হাবিব উল্লাহ পরিবারের। পরবর্তীতে ৩ আগস্ট রাতে তিনি লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে গেইম দেন। এরপর থেকেই হাবিব উল্লাহ নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁরা মূলত সমুদ্রপথে গ্রিস যাত্রার উদ্দেশ্যে ‘গেমে’ (নৌকায় যাত্রা) ওঠার পর থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ যুবকদের মধ্যে কেউ এক মাস, আবার কেউ ২১ দিন ধরে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
হাবিব উল্লাহর বড় ভাই আব্দুল্লাহ বলেন, গেইমের এক সপ্তাহ আগে তার (হাবিব) সাথে আমাদের কথা হয়েছিল। এরপর ৩ আগস্ট তার গেইম হয়। গেইম পর থেকে আমরা তার কোন খোঁজ পাচ্ছি না। এমনকি দালালও তার কোন খোঁজ দিতে পারছে না। একই ইউনিয়নের বাগময়না গ্রামের জুয়েল আহমদ টিপু বিগত ৬ মাস আগে দিরাই উপজেলার এক দালালের মাধ্যমে ১৬ লাখ টাকা চুক্তি লিবিয়া যান। সেখান থেকে ৩ আগস্ট গ্রিসে যাওয়ার জন্য গেইমেই উঠলে তিনি নিখোঁজ হন।
জুয়েলের মামা সাফি তালুকদার বলেন, ৩ আগস্ট দুপুরে আমার বড় ভাইয়ের সাথে আমার ভাগনা শেষবারের মতো ফোনালাপ হয়। এরপর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। তার চিন্তায় তার মা দিশেহারা হয়ে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তবে দালাল বলছে আমার ভাগনা নাকি মিশরের একটি হাসপাতালে জীবিত রয়েছে।
অপরদিকে দুই মাস আগে হিজলা গ্রামের ইউসুফ আলী ও তার বাবার তালতো ভাই কুড়িকেয়ার গ্রামের সায়েক মিয়া ২৬ লাখ টাকা চুক্তিতে চিলাউড়া গ্রামের করিম দালালের মাধ্যমে গত ১ জুলাই বাড়ি ছাড়েন এবং লিবিয়া পৌঁছে এক মাস আগে গ্রিসের উদ্দেশে গেইমে অংশ নেন। এরপর থেকেই তারা দুইজন নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়াও ভবানীপুরের সাইফু মিয়া ১৮ জুলাই লিবিয়া থেকে গেইম উঠে এক মাস ধরে নিখোঁজে আছেন।
ইউসুফ আলীর বাবা ছালিক মিয়া বলেন, আমার ছেলে ও আমার তালতো ভাই তারা দুইজন এক সাথে লিবিয়া যায় এবং তারা একই দিনে নিখোঁজ হয়। একমাসেও দালাল তাদের কোন খোঁজ দিতে পারেনি।
এদিকে, একই ঘটনায় গত এক মাস যাবৎ চিলাউড়া গ্রামের রুবেল মিয়া ও পৌরসভার ভবানীপুরের সাইফু মিয়া নিখোঁজ রয়েছেন।স্বজনদের ধারণা, গ্রিসে না পৌঁছানো বোটটির কোনো একটি স্থানে তারা এখনও বেঁচে আছেন এবং শিগগিরই ভালো কোনো খবর আসবে। আর এই আশায় বুক বাঁধছেন ওই নিখোঁজ ৬ যুবকের পরিবার।
এ ব্যাপারে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ ইসলাম উদ্দীন বলেন, আমরা নিখোঁজদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে তাদের তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করছি।
উল্লেখ্য, গত ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে ৪২ জন যাত্রী নিয়ে একটি রাবার নৌকা গ্রিসের উদ্দেশেজ যাত্রা শুরু করেছিল। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানের নাগরিক। নৌকাটি একটি স্পিডবোট ইঞ্জিন দ্বারা পরিচালিত হলেও এতে কোনো উপযুক্ত নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না, ফলে এটি দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। সমুদ্রের মাঝপথে নৌকাটির ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায় এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। একই সঙ্গে খাবার ও পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। অনাহার, প্রচণ্ড সূর্যের তাপ ও চরম পানিশূন্যতায় টানা ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার সময় অন্তত ১১ জন মৃত্যুবরণ করেন। এদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি ও ২জন সুদানির মরদেহ বাধ্য হয়ে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৩ আগস্ট স্রোতের টানে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছালে সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া ৩০ জনের মধ্যে মারাত্মক অসুস্থদের হাসপাতালে ভর্তি করা হন। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে তাদের অনেকের শরীরে পচন ধরেছে। হাসপাতালে ভর্তিকৃত একজনের একটি ভিডিও বার্তায় এ তথ্য জানা যায়।
জগন্নাথপুর প্রতিনিধি: গোলাম সারোয়ার 


















