০৪:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লিবিয়া থেকে গ্রিসযাত্রা পথে নিখোঁজ শান্তিগঞ্জের ছয় তরুণ, উৎকন্ঠায় পরিবার

ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়া পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছেন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত ছয় তরুণ। তাঁদের মধ্যে ১৭ বছর বয়সী হৃদয় পালও রয়েছেন। নিখোঁজ সন্তানদের সন্ধানে দিন-রাত উৎকণ্ঠায় সময় কাটছে স্বজনদের। কেউ কেউ নানা ধরনের তথ্য পেলেও সেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারছেন না পরিবারগুলো।

হৃদয় পাল পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্দন গ্রামের পালপাড়ার বাসিন্দা। চলতি বছর পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তাঁর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে প্রায় আড়াই মাস আগে পড়াশোনা ছেড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তিনি। ভারতের নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান হৃদয়।

লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রায় ১৫ দিন নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর। বাবা রন্টু চন্দ্র পাল ফোনে ছেলেকে সতর্ক করতেন, যেন কারও সঙ্গে ঝামেলায় না জড়ান। পরিবারের ভাষ্য, গত ১ আগস্ট গ্রিসে যাওয়ার জন্য কথিত ‘গেম’ হওয়ার কথা ছিল। এরপর থেকেই হৃদয়ের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

হৃদয়ের সঙ্গে একই পথে ছিলেন পাথারিয়া ইউনিয়নের শ্যামনগর গ্রামের তিনজন, জয়কলস ইউনিয়নের ডুংরিয়া গ্রামের একজন এবং পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের একজন। পরে তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যুক্ত হন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাঁদের মধ্যে অনেকে গ্রিসে পৌঁছেছেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। তবে হৃদয়ের কোনো সন্ধান এখনো মেলেনি।

একইভাবে নিখোঁজ রয়েছেন ডুংরিয়া গ্রামের ২৮ বছর বয়সী সোহেল মিয়া। ইছন মিয়ার পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সোহেল সবার বড়। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে ভাগ্য বদলের আশায় কথিত ‘বাইরোডে’ ইউরোপে যাওয়ার পথে লিবিয়ায় পৌঁছেছিলেন তিনি। এরপর গ্রিস যাওয়ার পথেই তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।

নিখোঁজদের তালিকায় আরও রয়েছেন পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের মো. তালহা এবং চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খাঁন। পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শান্তিগঞ্জ উপজেলার তিন ইউনিয়নের অন্তত ছয় তরুণের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

নিখোঁজ তরুণদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নেই বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁরা লিবিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে তাঁদের সন্তানদের বিদেশে পাঠানো হয়েছে। তবে কার মাধ্যমে কে লিবিয়ায় গেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অনেকে এখনো রাজি নন। তাঁদের ভাষ্য, বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন তাঁরা।

অনুসন্ধানে ডুংরিয়া গ্রামের সোহেল মিয়া ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের হৃদয় পালকে লিবিয়ায় পাঠানোর সঙ্গে ডুংরিয়া গ্রামের কুদ্দুস মিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কুদ্দুস মিয়া তাঁদের লিবিয়ায় পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও ক্যামেরার সামনে বা রেকর্ডে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তাঁর বক্তব্যের একটি গোপন ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।

নিখোঁজ এনামুল খানের বাবা ইসলাম উদ্দিন বলেন, তাঁর ছেলে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার কথা ছিল। এখন কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে চাইছি না। অপেক্ষা করছি, খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছি। মাধ্যমগুলোও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদি আমার ছেলের কোনো ক্ষতি হয়, আমরাই আপনাদের ডেকে সবকিছু বলব।”

হৃদয় পালের বাবা রন্টু চন্দ্র পাল বলেন, ছেলের বিষয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলছেন। কেউ বলছেন মিশরের হাসপাতালে, আবার কেউ বলছেন তাঁর ছেলে আর নেই। এ কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। রন্টু চন্দ্র পাল বলেন, দয়া করে আমার ছেলেকে নিয়ে কেউ বিভ্রান্তিকর কোনো তথ্য দেবেন না। যারা নিয়েছে, তারা চেষ্টা করছে। আমরাও আশাবাদী। নিশ্চয়ই ভগবান আমাদের ওপর রুষ্ট হবেন না।

হৃদয় ও সোহেলকে লিবিয়া পাঠানোর অভিযোগ ওঠা কুদ্দুস মিয়া ক্যামেরার সামনে বক্তব্য না দিলেও বলেন, তাঁরা নিখোঁজ হননি এবং তাঁদের খুঁজে পেতে কাজ চলছে। এ বক্তব্যের একটি গোপন ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।

এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অলী উল্লাহ বলেন, নিখোঁজদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পুলিশ কথা বলেছে। একজন ছাড়া বাকিদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে স্বজনেরা পুলিশকে জানিয়েছেন।

টেগ :
জনপ্রিয় পোস্ট

লিবিয়া থেকে গ্রিসযাত্রা পথে নিখোঁজ শান্তিগঞ্জের ছয় তরুণ, উৎকন্ঠায় পরিবার

লিবিয়া থেকে গ্রিসযাত্রা পথে নিখোঁজ শান্তিগঞ্জের ছয় তরুণ, উৎকন্ঠায় পরিবার

আপডেট সময় : ০৯:০৫:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়া পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছেন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত ছয় তরুণ। তাঁদের মধ্যে ১৭ বছর বয়সী হৃদয় পালও রয়েছেন। নিখোঁজ সন্তানদের সন্ধানে দিন-রাত উৎকণ্ঠায় সময় কাটছে স্বজনদের। কেউ কেউ নানা ধরনের তথ্য পেলেও সেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারছেন না পরিবারগুলো।

হৃদয় পাল পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্দন গ্রামের পালপাড়ার বাসিন্দা। চলতি বছর পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তাঁর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে প্রায় আড়াই মাস আগে পড়াশোনা ছেড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তিনি। ভারতের নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান হৃদয়।

লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রায় ১৫ দিন নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর। বাবা রন্টু চন্দ্র পাল ফোনে ছেলেকে সতর্ক করতেন, যেন কারও সঙ্গে ঝামেলায় না জড়ান। পরিবারের ভাষ্য, গত ১ আগস্ট গ্রিসে যাওয়ার জন্য কথিত ‘গেম’ হওয়ার কথা ছিল। এরপর থেকেই হৃদয়ের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

হৃদয়ের সঙ্গে একই পথে ছিলেন পাথারিয়া ইউনিয়নের শ্যামনগর গ্রামের তিনজন, জয়কলস ইউনিয়নের ডুংরিয়া গ্রামের একজন এবং পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের একজন। পরে তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যুক্ত হন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাঁদের মধ্যে অনেকে গ্রিসে পৌঁছেছেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। তবে হৃদয়ের কোনো সন্ধান এখনো মেলেনি।

একইভাবে নিখোঁজ রয়েছেন ডুংরিয়া গ্রামের ২৮ বছর বয়সী সোহেল মিয়া। ইছন মিয়ার পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সোহেল সবার বড়। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে ভাগ্য বদলের আশায় কথিত ‘বাইরোডে’ ইউরোপে যাওয়ার পথে লিবিয়ায় পৌঁছেছিলেন তিনি। এরপর গ্রিস যাওয়ার পথেই তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।

নিখোঁজদের তালিকায় আরও রয়েছেন পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের মো. তালহা এবং চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খাঁন। পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শান্তিগঞ্জ উপজেলার তিন ইউনিয়নের অন্তত ছয় তরুণের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

নিখোঁজ তরুণদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নেই বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁরা লিবিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে তাঁদের সন্তানদের বিদেশে পাঠানো হয়েছে। তবে কার মাধ্যমে কে লিবিয়ায় গেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অনেকে এখনো রাজি নন। তাঁদের ভাষ্য, বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন তাঁরা।

অনুসন্ধানে ডুংরিয়া গ্রামের সোহেল মিয়া ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের হৃদয় পালকে লিবিয়ায় পাঠানোর সঙ্গে ডুংরিয়া গ্রামের কুদ্দুস মিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কুদ্দুস মিয়া তাঁদের লিবিয়ায় পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও ক্যামেরার সামনে বা রেকর্ডে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তাঁর বক্তব্যের একটি গোপন ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।

নিখোঁজ এনামুল খানের বাবা ইসলাম উদ্দিন বলেন, তাঁর ছেলে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার কথা ছিল। এখন কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে চাইছি না। অপেক্ষা করছি, খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছি। মাধ্যমগুলোও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদি আমার ছেলের কোনো ক্ষতি হয়, আমরাই আপনাদের ডেকে সবকিছু বলব।”

হৃদয় পালের বাবা রন্টু চন্দ্র পাল বলেন, ছেলের বিষয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলছেন। কেউ বলছেন মিশরের হাসপাতালে, আবার কেউ বলছেন তাঁর ছেলে আর নেই। এ কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। রন্টু চন্দ্র পাল বলেন, দয়া করে আমার ছেলেকে নিয়ে কেউ বিভ্রান্তিকর কোনো তথ্য দেবেন না। যারা নিয়েছে, তারা চেষ্টা করছে। আমরাও আশাবাদী। নিশ্চয়ই ভগবান আমাদের ওপর রুষ্ট হবেন না।

হৃদয় ও সোহেলকে লিবিয়া পাঠানোর অভিযোগ ওঠা কুদ্দুস মিয়া ক্যামেরার সামনে বক্তব্য না দিলেও বলেন, তাঁরা নিখোঁজ হননি এবং তাঁদের খুঁজে পেতে কাজ চলছে। এ বক্তব্যের একটি গোপন ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।

এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অলী উল্লাহ বলেন, নিখোঁজদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পুলিশ কথা বলেছে। একজন ছাড়া বাকিদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে স্বজনেরা পুলিশকে জানিয়েছেন।