বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যের মূল্য যেখানে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেখানে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা অন্যতম পণ্য ধানের মূল্য প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের হানি, অন্যদিকে কৃষকরা তাদের শ্রম ঘাম বিকিয়ে ধানের উৎপাদন খরচ পাওয়াতো দূরের কথা, ফসল ঘরে তুলতে গিয়ে লোকসানের বোঝা দিন দিন ভারী হচ্ছে।
হাওরাঞ্চলে প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ একমাত্র বোরো ফসল আবাদ করে ধান উৎপাদনের মাধ্যমে নিজেদের চাহিদা পূরণ করে উদ্বৃত্ত অর্থ সঞ্চয় করে থাকে। কিন্তু এইবার সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় দ্রব্যমূল্যের ন্যায় ধানের মূল্য পর্যাপ্ত না থাকায় চরম সংকটে পড়েছে প্রান্তিক কৃষকরা।
জানাযায়, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বোরো ধান সংগ্রহের মূল্য প্রতি মণ ১,৪৪০ টাকা হলেও, শাল্লার খোলা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। আবার কালচে ধানের মূল্য ৫০০ টাকার বেশি দিতে রাজি নয় খরিদদাররা। এদিকে কৃষকের নিজস্ব প্রতি কেয়ার জমিতে ধান রোপন থেকে কাটা পর্যন্ত প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আবার ইজারা নিয়ে জমি চাষ করে ধান উৎপাদনে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এই জমি থেকে ধান পাওয়া যায় ১৫-২০ মণ। এই হিসেবে উৎপাদিত ধানের মূল্য কম হওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ তুলতেও হিমশিম খাচ্ছে। ফলস্বরূপ জমি আবাদের প্রতি অনীহা জন্ম নিচ্ছে কৃষকদের।

ধানের চেয়ে চালের মূল্য চড়া: বাজারে ধানের মূল্য কম হলেও কিন্তু চালের মূল্য চড়া। প্রতি মন চাল কিনতে হয় ২৮০০-৩০০০ টাকায়। শুধু তাই নয়, একজন শ্রমিককে প্রতিদিন কাজের পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে দেড় মন ধানের দামে। যা বর্তমান সময়ে আকাশচুম্বী।
কৃষকের বক্তব্য: প্রবীণ কৃষক নিকুঞ্জ সরকার বলেন, একদিকে ফসলের ক্ষতি অন্যদিকে ধানের দাম কমে সাধারণ মানুষের চোখ প্রায় অন্ধকার। সরকার মোটামুটি ধানের দাম ভালই দিছিল এই হিসাবে গোদামে ধান দেওয়ার লাগি কৃষি কার্ড জমা দিছলাম। কিন্তু ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান দেওয়ার কথা থাকলেও আগস্টের পয়লা সপ্তাহে সিরিয়াল জানতে গিয়া শুনি গোদামে ধান আর নিত না। কাল ধান এমনি সমস্যা ফ্রেশ ধান নিয়াও বিপদে আছি। এখন পাইকারে ভালা ধান কয় ৮০০ টেকা আর কালা ধান ৫০০ টেকা। বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়তি, ধানের দাম এমন থাকলে মানুষ কেমনে বাঁচবে?
কৃষক সুমন জানান, গতবারের ৫০০ মন ধানই এখনও ঘরে আছে। এবারের কথা আপনে বুঝইন না? পাইন্নে জমিনের ক্ষতি বতিতো অইছেই! এরপরেও আশা করছিলাম সরকার ধানের দাম বাড়াইবো কিন্তু গতবাবের তুলনায় এবার আরও কম। ১২ জন মানুষের পরিবারে চাকরি বাকরি নাই, ক্ষেতের (জমি) উপর নির্ভরশীল। আমরাতো ধান ছাড়া অন্যকোনো আয়ের পথ নাই। সরকারের উচিত অন্যান্য জিনিসের তুলনায় ধানের দাম বাড়াইত। না অয় জিনিসের দাম কামাইত এছাড়া মানুষের কোনো উপায় থাকত না। আমরার কান্দা (কান্না) কেডায় (কে) হুনব (শুনব) কেডায় দেখব।
এখানেই শেষ নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওরের ফসল হানি হয় এটা যেমন সত্যি, আবার হাওরে অপরিকল্পিত সিস্টেমে কাজ করার কারণে কৃত্রিম দুর্যোগে ক্ষতি হচ্ছে কৃষকরা। গত মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারনে জলাবদ্ধতায় বহু জমি তলিয়ে গিয়ে ধান ও খড় (গোখাদ্য) পঁচে নষ্ট হয়েছিল। এতে ধানের সাথে গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দেয়। ফলে অনেক কৃষক তাদের গরু বাছুর কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। পূর্বের ঋণ পরিশোধ করাতো দূরের কথা আগামী মৌসুমে বোরো ফসল ফলাতে নতুন করে ধার দেনা বা ঋণ করা ব্যতীত কোনো বিকল্প উপায় নেই।
উত্তোরনের উপায়: হাওরাঞ্চল বিশেষ করে শাল্লার মতো এলাকায় কৃষকদের বাঁচানোর একমাত্র উপায় তাদের উৎপাদিত ধানের পর্যাপ্ত মূল্য দিতে হবে, নতুবা সরকারি গোদামে প্রত্যেক কৃষকের ধান সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি জমির ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত সব পণ্যের দাম অবশ্যই হ্রাস করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সঠিক পরিকল্পনা করে হাওরের ফসলকে রক্ষায় কাজ করতে হবে। অন্যতায় কৃষি ফসল উৎপাদনে কৃষকদের মাঝে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। এতে করে দারিদ্র্যতা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে জানান প্রান্তিক কৃষক ও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের শাল্লা শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত সেন।
এদিকে শাল্লা উপজেলা কৃষকদলের সদস্য সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, গত বৈশাখে দুর্যোগে ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে এই সংকট এখনো কাটে নি। অন্যদিকে খোলা বাজারে ধানের দাম মন প্রতি ৫০০ টাকা, এতো অল্প ধানের মূল্য থাকায় কৃষক এখন দিশেহারা। সরকারের কাছে অনুরোধ কৃষকদের বাঁচাতে অতি দ্রুত সব দিক বিবেচনায় নিয়ে ধানের মূল্য বৃদ্ধি করা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, সরকার কর্তৃক ধানের মূল্য নির্ধারণ করে গোদামে ধান সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে গোদামের চেয়ে খোলা বাজারে ধানের মূল্য কিছুটা কম। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকদের ফসলের ক্ষতি হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের সুবিধার্থে কৃষি কার্ডের কাজ চলমান রয়েছে।
শাল্লা প্রতিনিধি: সন্দীপন তালুকদার সুজন 


















