১১:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাওরের রূপালী দিন শেষ: বিলুপ্তির পথে দেশীয় মাছ, বিপন্ন জেলেজীবন

ছবি: সংগ্রহীত

বর্ষার থৈ থৈ জলে একসময় সুনামগঞ্জের বিস্তৃত হাওরাঞ্চল রূপ নিত এক প্রাকৃতিক মৎস্য ভা-ারে। কালিয়াকুঠা, চাপতি, নলুয়া কিংবা মইয়ার হাওরে সূর্য ওঠার আগেই জেলেদের জালে ধরা পড়ত বোয়াল, গজার, আইড়, বড় বাইন, গুচি ও মাগুরসহ প্রায় ষাটটিরও বেশি প্রজাতির দেশীয় রূপালী মাছ।

 

কিন্তু কালের নির্মম আবর্তে এবং মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক নানা প্রতিকূলতায় সেই সমৃদ্ধ অতীত এখন শুধুই স্মৃতি। জল আছে, বিশাল হাওর আছে; কিন্তু জালে মাছ নেই। ভরা বর্ষা মৌসুমেও শূন্য হাতে ঘরে ফেরা জেলেদের চোখে-মুখে ফুটে উঠছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গভীর হাহাকার।একসময় বর্ষার ভরা মৌসুমে হাওরাঞ্চলে জেলেদের পাতানো জালে ধরা পড়তো ভিন্ন প্রকৃতির দেশীয় মাছ। কিন্তুু কালের আবর্তনে তা যেনো এখন দিনদিন হাওর থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

 

যার ফলে আজ এই ভরা মৌসুমেও মাথায় হাত দিয়ে হাহাকার করছে মৎস্য নির্ভরশীল একদল জেলে সমাজ। হাওর বাওড়ের এলাকা সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, জেলেরা দিনরাত হাওরের এই বিস্তীর্ন জলাশয়ে ঢেউয়ের তালে দোল খাওয়া নৌকা নিয়ে মাছের আশায় পানিতে পড়ে থাকলেও আগেকার তুলনায় পাচ্ছে না তারা নানান প্রজাতির দেশীয় মাছের দেখা।দেশীয় মাছের তিন ভাগের একভাগও মিলছে না। মধ্যনগর উপজেলা মজমপুর এলাকার রিপন রায় জানান, দিন যতো যাচ্ছে ততো এসব প্রকার মাছ গুলোর নাম গন্ধও বিলিন হচ্ছে। আগের দিন গুলোতে পাঁচজন মানুষ জালের নৌকা নিয়ে বেরুলে জনপ্রতি হাজার-বারোশো করে পকেটে নিয়ে ঘরে ফিরতাম এখন নিজের ভাগ মেলাতে কঠিন শ্রম দিতে হয়।দিন দিন ভিন্ন জাতের দেশীয় মাছ গুলো বিলুপ্ত হওয়া প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) সন্দিপন মজুমদার বলেন, বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে কিছু কারণ থেকে যায় যেমন আগের দিনের মতো এখন আর হাওরে তেমন পানি হয় না। তুলনামূলক কম হওয়াতে দেশীয় প্রজাতির মাছের দেখা কম হওয়াটাই স্বাভাবিক।

 

তিনি বলেন সুনামগঞ্জের হাওর গুলোর নানান প্রজাতির মাছ বাজারে ওঠতে দেখা যায়। পোনা মাছ নিধনের ব্যাপারে জানতে চাইলে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অভ্যাহত আছে বলে জানান তিনি।

 

হাওরে দেশীয় প্রজাতির মাছ উধাও হয়ে যাওয়া কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়, এটি হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেমে আসা এক মারাত্মক প্রহার। অতীতে যেখানে এক বেলার জালের টানে পুরো পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা হয়ে যেত, আজ দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়েও নিজের ভাগের ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

দেশীয় প্রজাতিগুলো এভাবে হারিয়ে যেতে থাকলে শুধু পুষ্টির সংকটই তৈরি হবে না, বিলুপ্ত হবে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এক পেশা ও সংস্কৃতি।মাছ বিলুপ্তির পেছনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং জলাশয়ের নাব্যতাসংকটকে দায়ী করা হলেও মূল সমস্যা কিন্তু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়।

 

কেন খালি হচ্ছে হাওরের পেট? পোনা মাছের অবাধ নিধন: নিষিদ্ধ কারেন্ট ও চায়না দুয়ারী জালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ছোট-বড় সব প্রজাতির পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ ধ্বংস করে দিচ্ছে।

 

জলাশয় সংকুচিত হওয়া: পলি জমে নদী ও হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং মুক্ত জলাশয় ইজারা দিয়ে কৃত্রিমভাবে পানি শুকিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা। প্রাকৃতিক আবাসের বিনাশ: অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, রাসায়নিক সারের অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ এবং বিলে পানি ধরে রাখার স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হওয়া।

 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান বা নজরদারির আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এর সুফল কিন্তু হাওরবাসী পর্যাপ্ত পাচ্ছেন না। কালবিলম্ব না করে দেশীয় মৎস্যসম্পদ রক্ষায় জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।উত্তরণের কার্যকর পথ

১. মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন ও সংস্কার: হাওরের গভীর অংশগুলোতে স্থায়ী অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বছরজুড়ে মাছ অবাধে প্রজনন ও বিচরণ করতে পারে।

২. নিষিদ্ধ জালের প্র প্রয়োগ বন্ধ: পোনা মাছ ও ডিমওয়ালা মাছ রক্ষায় অবৈধ জাল বাজেয়াপ্তকরণ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. প্রাকৃতিক নাব্যতা ফিরিয়ে আনা: হাওর ও নদীগুলোর সংযোগস্থল খনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও গভীরতা বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

৪. জেলেদের বিকল্প সহায়তা: প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার সময়ে জেলেদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা জোরালো করা জরুরি। সুনামগঞ্জের হাওর কেবল মাছের উৎস নয়, এটি এ দেশের প্রাণ প্রকৃতির এক অনন্য প্রতীক। হাওরের এই জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় মাছের অস্তিত্ব হারিয়ে গেলে তার খেসারত দিতে হবে সমগ্র দেশের খাদ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে। প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল সম্ভব এই বিষাদের ছায়াকে দূর করে হাওরের রূপালী গৌরব ফিরিয়ে আনা।

টেগ :
জনপ্রিয় পোস্ট

প্রধানমন্ত্রী’র নির্দেশে বৃক্ষ রোপন কর্মসূচির অংশ হিসেবে জামালগঞ্জে বৃক্ষরোপণ

হাওরের রূপালী দিন শেষ: বিলুপ্তির পথে দেশীয় মাছ, বিপন্ন জেলেজীবন

আপডেট সময় : ০৬:৫৮:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

বর্ষার থৈ থৈ জলে একসময় সুনামগঞ্জের বিস্তৃত হাওরাঞ্চল রূপ নিত এক প্রাকৃতিক মৎস্য ভা-ারে। কালিয়াকুঠা, চাপতি, নলুয়া কিংবা মইয়ার হাওরে সূর্য ওঠার আগেই জেলেদের জালে ধরা পড়ত বোয়াল, গজার, আইড়, বড় বাইন, গুচি ও মাগুরসহ প্রায় ষাটটিরও বেশি প্রজাতির দেশীয় রূপালী মাছ।

 

কিন্তু কালের নির্মম আবর্তে এবং মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক নানা প্রতিকূলতায় সেই সমৃদ্ধ অতীত এখন শুধুই স্মৃতি। জল আছে, বিশাল হাওর আছে; কিন্তু জালে মাছ নেই। ভরা বর্ষা মৌসুমেও শূন্য হাতে ঘরে ফেরা জেলেদের চোখে-মুখে ফুটে উঠছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গভীর হাহাকার।একসময় বর্ষার ভরা মৌসুমে হাওরাঞ্চলে জেলেদের পাতানো জালে ধরা পড়তো ভিন্ন প্রকৃতির দেশীয় মাছ। কিন্তুু কালের আবর্তনে তা যেনো এখন দিনদিন হাওর থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

 

যার ফলে আজ এই ভরা মৌসুমেও মাথায় হাত দিয়ে হাহাকার করছে মৎস্য নির্ভরশীল একদল জেলে সমাজ। হাওর বাওড়ের এলাকা সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, জেলেরা দিনরাত হাওরের এই বিস্তীর্ন জলাশয়ে ঢেউয়ের তালে দোল খাওয়া নৌকা নিয়ে মাছের আশায় পানিতে পড়ে থাকলেও আগেকার তুলনায় পাচ্ছে না তারা নানান প্রজাতির দেশীয় মাছের দেখা।দেশীয় মাছের তিন ভাগের একভাগও মিলছে না। মধ্যনগর উপজেলা মজমপুর এলাকার রিপন রায় জানান, দিন যতো যাচ্ছে ততো এসব প্রকার মাছ গুলোর নাম গন্ধও বিলিন হচ্ছে। আগের দিন গুলোতে পাঁচজন মানুষ জালের নৌকা নিয়ে বেরুলে জনপ্রতি হাজার-বারোশো করে পকেটে নিয়ে ঘরে ফিরতাম এখন নিজের ভাগ মেলাতে কঠিন শ্রম দিতে হয়।দিন দিন ভিন্ন জাতের দেশীয় মাছ গুলো বিলুপ্ত হওয়া প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) সন্দিপন মজুমদার বলেন, বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে কিছু কারণ থেকে যায় যেমন আগের দিনের মতো এখন আর হাওরে তেমন পানি হয় না। তুলনামূলক কম হওয়াতে দেশীয় প্রজাতির মাছের দেখা কম হওয়াটাই স্বাভাবিক।

 

তিনি বলেন সুনামগঞ্জের হাওর গুলোর নানান প্রজাতির মাছ বাজারে ওঠতে দেখা যায়। পোনা মাছ নিধনের ব্যাপারে জানতে চাইলে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অভ্যাহত আছে বলে জানান তিনি।

 

হাওরে দেশীয় প্রজাতির মাছ উধাও হয়ে যাওয়া কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়, এটি হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেমে আসা এক মারাত্মক প্রহার। অতীতে যেখানে এক বেলার জালের টানে পুরো পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা হয়ে যেত, আজ দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়েও নিজের ভাগের ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

দেশীয় প্রজাতিগুলো এভাবে হারিয়ে যেতে থাকলে শুধু পুষ্টির সংকটই তৈরি হবে না, বিলুপ্ত হবে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এক পেশা ও সংস্কৃতি।মাছ বিলুপ্তির পেছনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং জলাশয়ের নাব্যতাসংকটকে দায়ী করা হলেও মূল সমস্যা কিন্তু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়।

 

কেন খালি হচ্ছে হাওরের পেট? পোনা মাছের অবাধ নিধন: নিষিদ্ধ কারেন্ট ও চায়না দুয়ারী জালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ছোট-বড় সব প্রজাতির পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ ধ্বংস করে দিচ্ছে।

 

জলাশয় সংকুচিত হওয়া: পলি জমে নদী ও হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং মুক্ত জলাশয় ইজারা দিয়ে কৃত্রিমভাবে পানি শুকিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা। প্রাকৃতিক আবাসের বিনাশ: অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, রাসায়নিক সারের অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ এবং বিলে পানি ধরে রাখার স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হওয়া।

 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান বা নজরদারির আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এর সুফল কিন্তু হাওরবাসী পর্যাপ্ত পাচ্ছেন না। কালবিলম্ব না করে দেশীয় মৎস্যসম্পদ রক্ষায় জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।উত্তরণের কার্যকর পথ

১. মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন ও সংস্কার: হাওরের গভীর অংশগুলোতে স্থায়ী অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বছরজুড়ে মাছ অবাধে প্রজনন ও বিচরণ করতে পারে।

২. নিষিদ্ধ জালের প্র প্রয়োগ বন্ধ: পোনা মাছ ও ডিমওয়ালা মাছ রক্ষায় অবৈধ জাল বাজেয়াপ্তকরণ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. প্রাকৃতিক নাব্যতা ফিরিয়ে আনা: হাওর ও নদীগুলোর সংযোগস্থল খনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও গভীরতা বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

৪. জেলেদের বিকল্প সহায়তা: প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার সময়ে জেলেদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা জোরালো করা জরুরি। সুনামগঞ্জের হাওর কেবল মাছের উৎস নয়, এটি এ দেশের প্রাণ প্রকৃতির এক অনন্য প্রতীক। হাওরের এই জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় মাছের অস্তিত্ব হারিয়ে গেলে তার খেসারত দিতে হবে সমগ্র দেশের খাদ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে। প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল সম্ভব এই বিষাদের ছায়াকে দূর করে হাওরের রূপালী গৌরব ফিরিয়ে আনা।