বাঙালি প্রবাদে আছে, ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা রূপ নিয়েছে যেন এক ধীরগতির বিষে।
বিশেষ করে সয়াবিন তেল, চিনি এবং দুধের মতো অতিপ্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি পুরো জনস্বাস্থ্যকে এক গভীর শঙ্কার মুখে ঠেলে দিয়েছে। যে খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার ও শক্তি অর্জনের রসদ হওয়ার কথা, তা-ই আজ নীরবে ডেকে আনছে মরণব্যাধি।
দৈনন্দিন রান্নায় সয়াবিন তেল একটি অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু বাজারচলতি বহু ভোজ্যতেলে পোড়া তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ, অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষকরা বারবার সতর্ক করছেন। একইভাবে প্রক্রিয়াজাত অতিরিক্ত রিফাইনড চিনি শরীরে প্রবেশ করে কেবল ওজন বা ডায়াবেটিসই বাড়াচ্ছে না, বরং ক্যানসারের মতো ব্যাধির ঝুঁকি দ্বিগুণ করে দিচ্ছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয়টি ঘটছে দুধের ক্ষেত্রে। শিশুদের পুষ্টির প্রধান উৎস যে দুধ, তাতে অ্যান্টিবায়োটিক, সীসা, ডিটারজেন্ট কিংবা ইউরিয়ার মতো বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ছে বিভিন্ন পরীক্ষায়।
এই ‘অদৃশ্য বিষ’ একদিনে কাউকে শেষ করে দেয় না; বরং এটি মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ধীরে ধীরে বিকল করে দেয়। কিডনি জটিলতা, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, কিংবা অসংক্রামক ব্যাধি হঠাৎ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে এই ভেজাল খাদ্যের প্রভাব। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, বরং এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাভাবিক মেধা ও শারীরিক বিকাশ পঙ্গু করে দেওয়ার শামিল।ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীদের দমানো যাচ্ছে না। কেবল সাময়িক জরিমানা কিংবা লোকদেখানিক অভিযানে সমাধান আসবে না।আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি:খাদ্য নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক বেঁচে থাকার অধিকার। ভেজালকারীদের রেহাই দেওয়া মানে লাখ লাখ মানুষের জীবনের সঙ্গে ছিনিমিনি খেলার অনুমতি দেওয়া।
এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে অবিলম্বে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:কঠোর আইন প্রয়োগ:ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানোর দায়ে জড়িতদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।উৎসবকেন্দ্রিক নয়, নিয়মিত নজরদারি: খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত গবেষণাগারভিত্তিক নিয়মিত ও কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা।গণসচেতনতা বৃদ্ধি:অতিরিক্ত চিনি, ট্রান্সফ্যাট ও কেমিক্যালযুক্ত খাবারের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানো। খাদ্যে ভেজাল বা অদৃশ্য বিষ মেশানো একটি নীরব হত্যাকা-।
এই বিষাক্ত চক্র থেকে দেশকে মুক্ত করতে না পারলে এক অকালপঙ্গু জাতির মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শূন্য সহনশীলতা (তবৎড় ঞড়ষবৎধহপব) নীতি গ্রহণ করে প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সম্পাদকীয় 
















