০৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেঙ্গু নাকি চিকুনগুনিয়া? উপসর্গে মিল, তবু পার্থক্য জানলে বুঝবেন সহজে

সমাজ বার্তা স্বাস্থ্য ডেস্ক | ঢাকা:
দেশজুড়ে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া—এই দুই ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। উপসর্গে মিল থাকায় অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন—নিজের জ্বরটি ডেঙ্গু, নাকি চিকুনগুনিয়া? চিকিৎসকরা বলছেন, উপসর্গে সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ্য করলে প্রাথমিকভাবে ধারণা পাওয়া সম্ভব, কোন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

চিকুনগুনিয়ায় গিরায় গিরায় ভয়াবহ ব্যথা

ঢাকার বসুন্ধরা এলাকার বাসিন্দা মাকসুদা আনছারী তিন সপ্তাহ ধরে তীব্র ব্যথায় ভুগছেন। প্রথমে ডেঙ্গু টেস্ট করালে ফলাফল নেগেটিভ আসে, পরে চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে।
তিনি বলেন,

“এখনও পায়ের গিরায় গিরায় এমন ব্যথা হয় যে হাঁটতেই পারি না। হাত-পায়ের জয়েন্ট ফুলে গেছে, রাতে ঘুমাতে পারি না।”

চিকিৎসকরা বলছেন, চিকুনগুনিয়ার প্রধান উপসর্গই হলো জয়েন্টে তীব্র ব্যথা—যার কারণে রোগী হাঁটা-চলা করতে পারেন না। এজন্য একে অনেকে ‘ল্যাংড়া জ্বর’ও বলেন।


ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার পার্থক্য এক নজরে

বিষয় ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া
জ্বরের ধরণ হঠাৎ উচ্চ তাপমাত্রা, ৫–৭ দিন স্থায়ী ২–৩ দিন তীব্র জ্বর, পরে থেমে থেমে আসে
ব্যথা শরীরে ব্যথা তুলনামূলক কম জয়েন্টে তীব্র ব্যথা, হাঁটাচলায় কষ্ট
র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি শরীরে র‍্যাশ বেশি হয় সাধারণত র‍্যাশ হয় না
প্লাটিলেট কমে যাওয়া কমে, রক্তক্ষরণ হয় কমে না
মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক বেশি প্রায় নেই
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সাধারণত নেই দীর্ঘদিন জয়েন্ট পেইন থাকে
অঙ্গ ক্ষতি লিভার, হার্ট, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সাধারণত হয় না

🔍 কখন টেস্ট করবেন?

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফরহাদুল ইসলাম জানান,

“জ্বরের দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ডেঙ্গু টেস্ট করা যায়। কিন্তু চিকুনগুনিয়া শনাক্ত করতে হয় পাঁচ থেকে সাত দিন পর। আগে করলে ফল নেগেটিভ আসে।”

চিকুনগুনিয়া সনাক্তে ব্যবহৃত হয় ICT for Chikungunya বা RT-PCR টেস্ট, যা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করে।

চিকিৎসা: পার্থক্য থাকলেও পদ্ধতি কাছাকাছি

চিকিৎসকদের মতে, দুটি রোগেই নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট বা উপসর্গ অনুযায়ী যত্নই মূল চিকিৎসা।

  • জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ
  • ডেঙ্গুতে ব্যথার ওষুধ নয়, কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় ব্যথা কমাতে হালকা পেইনকিলার দেওয়া যায়
  • প্রচুর তরল জাতীয় খাবার ও পানি পান
  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর ফলমূল খাওয়া জরুরি

ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন,

“ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে গেলে রক্ত দিতে হয়, কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় তা লাগে না। তবে জয়েন্টের ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয় বলে রোগীদের ধৈর্য ধরে থেরাপি নিতে হয়।”

একই মশায় দুই ভাইরাস!

চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া—দুটিই ছড়ায় এডিস মশার কামড়ে। শহরজুড়ে পানি জমে থাকা জায়গাগুলো, ফুলের টব, ড্রেন বা কনটেইনারে এই মশার জন্ম হয়।
বর্ষাকালে মশার সংখ্যা বাড়ার ফলে একই সঙ্গে দুই ভাইরাসের সংক্রমণও বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

✅ জ্বরের শুরুতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
✅ নিজে নিজে ব্যথার ওষুধ না খাওয়া
✅ মশা প্রতিরোধে বাড়ি-আঙিনা পরিষ্কার রাখা
✅ সকাল ও বিকেলে মশার কামড় থেকে সাবধান থাকা
✅ শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে দ্রুত টেস্ট করানো জরুরিচিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার উপসর্গ কাছাকাছি হলেও সময়মতো সঠিক টেস্টই রোগ শনাক্তের একমাত্র উপায়। অসতর্কতা বা দেরি করলে জটিলতা বাড়ে। তাই সামান্য জ্বর বা ব্যথাকেও অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া—দুটিই প্রতিরোধযোগ্য। মশার জন্মস্থল ধ্বংস করলেই এ দুটি রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। সচেতন থাকুন, মশা নিয়ন্ত্রণ করুন—নিজে বাঁচুন, পরিবারকে বাঁচান।

জনপ্রিয় পোস্ট

শাল্লায় ভুল তথ্যে সংবাদ প্রকাশে পুলিশের ক্ষোভ

ডেঙ্গু নাকি চিকুনগুনিয়া? উপসর্গে মিল, তবু পার্থক্য জানলে বুঝবেন সহজে

আপডেট সময় : ০২:৫৬:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ নভেম্বর ২০২৫

সমাজ বার্তা স্বাস্থ্য ডেস্ক | ঢাকা:
দেশজুড়ে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া—এই দুই ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। উপসর্গে মিল থাকায় অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন—নিজের জ্বরটি ডেঙ্গু, নাকি চিকুনগুনিয়া? চিকিৎসকরা বলছেন, উপসর্গে সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ্য করলে প্রাথমিকভাবে ধারণা পাওয়া সম্ভব, কোন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

চিকুনগুনিয়ায় গিরায় গিরায় ভয়াবহ ব্যথা

ঢাকার বসুন্ধরা এলাকার বাসিন্দা মাকসুদা আনছারী তিন সপ্তাহ ধরে তীব্র ব্যথায় ভুগছেন। প্রথমে ডেঙ্গু টেস্ট করালে ফলাফল নেগেটিভ আসে, পরে চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে।
তিনি বলেন,

“এখনও পায়ের গিরায় গিরায় এমন ব্যথা হয় যে হাঁটতেই পারি না। হাত-পায়ের জয়েন্ট ফুলে গেছে, রাতে ঘুমাতে পারি না।”

চিকিৎসকরা বলছেন, চিকুনগুনিয়ার প্রধান উপসর্গই হলো জয়েন্টে তীব্র ব্যথা—যার কারণে রোগী হাঁটা-চলা করতে পারেন না। এজন্য একে অনেকে ‘ল্যাংড়া জ্বর’ও বলেন।


ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার পার্থক্য এক নজরে

বিষয় ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া
জ্বরের ধরণ হঠাৎ উচ্চ তাপমাত্রা, ৫–৭ দিন স্থায়ী ২–৩ দিন তীব্র জ্বর, পরে থেমে থেমে আসে
ব্যথা শরীরে ব্যথা তুলনামূলক কম জয়েন্টে তীব্র ব্যথা, হাঁটাচলায় কষ্ট
র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি শরীরে র‍্যাশ বেশি হয় সাধারণত র‍্যাশ হয় না
প্লাটিলেট কমে যাওয়া কমে, রক্তক্ষরণ হয় কমে না
মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক বেশি প্রায় নেই
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সাধারণত নেই দীর্ঘদিন জয়েন্ট পেইন থাকে
অঙ্গ ক্ষতি লিভার, হার্ট, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সাধারণত হয় না

🔍 কখন টেস্ট করবেন?

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফরহাদুল ইসলাম জানান,

“জ্বরের দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ডেঙ্গু টেস্ট করা যায়। কিন্তু চিকুনগুনিয়া শনাক্ত করতে হয় পাঁচ থেকে সাত দিন পর। আগে করলে ফল নেগেটিভ আসে।”

চিকুনগুনিয়া সনাক্তে ব্যবহৃত হয় ICT for Chikungunya বা RT-PCR টেস্ট, যা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করে।

চিকিৎসা: পার্থক্য থাকলেও পদ্ধতি কাছাকাছি

চিকিৎসকদের মতে, দুটি রোগেই নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট বা উপসর্গ অনুযায়ী যত্নই মূল চিকিৎসা।

  • জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ
  • ডেঙ্গুতে ব্যথার ওষুধ নয়, কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় ব্যথা কমাতে হালকা পেইনকিলার দেওয়া যায়
  • প্রচুর তরল জাতীয় খাবার ও পানি পান
  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর ফলমূল খাওয়া জরুরি

ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন,

“ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে গেলে রক্ত দিতে হয়, কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় তা লাগে না। তবে জয়েন্টের ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয় বলে রোগীদের ধৈর্য ধরে থেরাপি নিতে হয়।”

একই মশায় দুই ভাইরাস!

চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া—দুটিই ছড়ায় এডিস মশার কামড়ে। শহরজুড়ে পানি জমে থাকা জায়গাগুলো, ফুলের টব, ড্রেন বা কনটেইনারে এই মশার জন্ম হয়।
বর্ষাকালে মশার সংখ্যা বাড়ার ফলে একই সঙ্গে দুই ভাইরাসের সংক্রমণও বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

✅ জ্বরের শুরুতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
✅ নিজে নিজে ব্যথার ওষুধ না খাওয়া
✅ মশা প্রতিরোধে বাড়ি-আঙিনা পরিষ্কার রাখা
✅ সকাল ও বিকেলে মশার কামড় থেকে সাবধান থাকা
✅ শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে দ্রুত টেস্ট করানো জরুরিচিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার উপসর্গ কাছাকাছি হলেও সময়মতো সঠিক টেস্টই রোগ শনাক্তের একমাত্র উপায়। অসতর্কতা বা দেরি করলে জটিলতা বাড়ে। তাই সামান্য জ্বর বা ব্যথাকেও অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া—দুটিই প্রতিরোধযোগ্য। মশার জন্মস্থল ধ্বংস করলেই এ দুটি রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। সচেতন থাকুন, মশা নিয়ন্ত্রণ করুন—নিজে বাঁচুন, পরিবারকে বাঁচান।