বর্ষা মৌসুম এলেই রূপসী বাংলার হাওরাঞ্চল এক বিশাল জলধিতে পরিণত হয়। চারদিকে থৈ থৈ পানি, উদ্দাম ঢেউ আর আর আফালের (হাওরের বিশাল ঢেউ) ভয়াল থাবা। রূপের এই প্রাচুর্যের আড়ালেই ঢাকা পড়ে থাকে হাওরবাসীর প্রতিদিনের বেঁচে থাকার নির্মম সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামের সবচেয়ে অসহায় শিকার হাওরাঞ্চলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। প্রতি বছর বর্ষা এলেই হাওরাঞ্চলে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় শত শত শিশুর পড়াশোনা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খেয়া পারাপার কিংবা উত্তাল ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য কেবল করুণই নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষার সমান অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।
শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। অথচ হাওরাঞ্চলের শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া মানেই এক ধরনের জীবন-মরণ পরীক্ষা। যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা, অপ্রতুল পরিবহন ব্যবস্থা এবং অনিরাপদ নৌযাত্রার কারণে বর্ষা এলেই এ অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
যেসব দুর্গম এলাকায় কোনো ট্রলার বা নৌকা মেলে না, সেখানে বাধ্য হয়ে শিশুরা দিনের পর দিন ঘরে বসেই দিন কাটায়। আর যারা সাহস করে বের হয়, তারাও থাকে চরম প্রাণহানির ঝুঁকিতে। মাঝেমধ্যেই হাওরে নৌকাডুবির খবর আসে, যার শিকার হয় নিষ্পাপ শিক্ষার্থীরা। সন্তানের স্কুলে যাওয়া মানেই হাওরের অভিভাবকদের জন্য সারাদিনের উৎকণ্ঠা।শুধু পরিবহন সংকটই নয়, বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলের বহু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পানিবন্দি হয়ে পড়ে। অনেক বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিংবা পানি উঠে শ্রেণি কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। ফলে সমতলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পড়াশোনার প্রতিযোগিতায় এমনিতেই পিছিয়ে পড়ে হাওরের সন্তানরা। পরবর্তীতে যা বৃদ্ধি করে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার (Drop out) হার এবং বাল্যবিয়ে বা শিশুশ্রমের মতো সামাজিক ব্যাধি।দীর্ঘদিনের এই পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধান কেবল স্থানীয় উদ্যোগে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সরাসরি ও বিশেষ হস্তক্ষেপ।
হাওরাঞ্চলকে সমতলের মতো এক ছাঁচে না মেপে, সেখানকার বিশেষ ভৌগোলিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে বিশেষ শিক্ষানীতি ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সময়ের দাবি ও করণীয়:নিরাপদ ‘স্কুল বোট’ চালু: বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকারের উদ্যোগে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে লাইফ জ্যাকেটসমৃদ্ধ ও নিরাপদ লাইফ-সেভিং ‘স্কুল বোট’ বা নৌ-পরিবহন সেবা চালু করতে হবে। ভাসমান ও আশ্রয়কেন্দ্রভিত্তিক বিদ্যালয়: বর্ষার সময়ে পানিবন্দি হয়ে পড়া এলাকাগুলোতে বিকল্প পাঠদানের অংশ হিসেবে ভাসমান বিদ্যালয় (Floating Schools) বা উঁচু আশ্রয়কেন্দ্রে অস্থায়ী শ্রেণি কার্যক্রম চালু করা দরকার।
লাইফ জ্যাকেট বিতরণ: হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে বর্ষার শুরুতেই সরকারি খরচে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য উন্নতমানের লাইফ জ্যাকেট সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।এলাকাভিত্তিক বিশেষ ক্যালেন্ডার: হাওরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে বর্ষা ও আফালের সময়টায় অ্যাকাডেমিক পঞ্জিকায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যেতে পারে, যাতে আবহাওয়া খারাপ থাকলে পড়ালেখার ঘাটতি বিকল্প উপায়ে (যেমন: শুকনো মৌসুমে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া) পোষানো যায়।উঁচু সাবমার্সিবল সড়ক ও জেটি নির্মাণ: স্থায়ী সমাধানের অংশ হিসেবে হাওরের গ্রামগুলো থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত যোগাযোগের জন্য উঁচু ডুবো সড়ক, নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং নিরাপদ নৌকা ঘাট নির্মাণ ত্বরান্বিত করতে হবে।
সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার পাওয়ার কথা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হাওরের শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাবে—তা আধুনিক রাষ্ট্রের কাম্য হতে পারে না। স্মার্ট বা উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তখনই সার্থক হবে, যখন হাওরের শেষ সীমানায় থাকা শিশুটিও নিরাপদে স্কুলে যেতে পারবে। হাওরের শিশুদের এই চরম অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ স্কুলযাত্রার ইতি টানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নদী-হাওরের ঢেউয়ের কাছে শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ যেন ডুবে না যায়—এটিই আমাদের আকুল আবেদন।
সম্পাদকীয় 














